1. emteeaz2017@gmail.com : সাহিত্য লিপি : সাহিত্য লিপি
  2. emteeaz2020@gmail.com : em-lipi :
  3. jaidmtarik@gmail.com : jaid :
  4. jaidmtarik@gmail.com : sahitto :
November 24, 2020, 3:54 am

অসত্য অতীত~রাজভী রায়হান শোভন

  • প্রকাশের সময়ঃ Monday, September 14, 2020
  • 50 পড়েছেন

দিপা নামের যে মেয়েটা গত পরশুদিন নিজের জন্মদিনে সুইসাইড করলো, সে আমার প্রেমিকা ছিলো।। পড়তো সিটি কলেজে, ওখানে থেকে বিবিএ এমবিএ শেষ করে একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকুরীও পেয়ে গিয়েছিলো।। কিন্তু বিশ্বাস করেন, দিপার আত্মহত্যার পিছনে ওর বাবা-মা যে কারণ বলেছে সেটা আমি কেনো, কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না।। পরে বলছি কি সেই কারণ, তার আগে আমার সাথে কিভাবে দিপার প্রেম বা পরিচয় হলো তা বলে নিই।। মাস পাঁচেক আগে মেয়েটার সাথে আমার রাস্তায় প্রথম দেখা হয়, খুব বেশি আলোচিত কোন দেখা না, সাদামাটাই বলা চলে।।

আমি কাওরানবাজারের মোড়ের ওখানে বাইকে বসে চা খাচ্ছিলাম, কই থেকে একটা মেয়ে এসে বললো- আপনি কি ফয়সাল??

আমি চায়ে চুমুক দেয়া বাদ রেখে বামে ঘুরে তাকালাম, সেই প্রথম দিপাকে দেখলাম।। জিন্স টপস্‌ পরা টিপটপ একটা মেয়ে, আমি ফয়সাল কিনা জানতে চাচ্ছে??

আমি জবাব দিলাম- না আমি ফয়সাল না, সরি।। কেনো??

দিপা চেহারার মধ্যে একটা বিব্রতভাবে ফুটিয়ে তুলে বললো- ও আচ্ছা, সরি সরি আমি আপনাকে পাঠাও ভেবেছিলাম।। আমার বাইকের নাম্বার চেক করা উচিত ছিলো, আসলে উনাকে এখানের লোকেশন বললাম, এখনো আসে নি, আপনি ছাড়া কাউকে দেখতেও পাচ্ছি না, তাই আর কি।।

একনাগাড়ে দিপা কথাগুলো বলে গেলো।।

যারা পাঠাও ব্যাপারটা বুঝেন না তাদের বলি, এটা একটা মোবাইলের এপ্লিকেশন, যার মাধ্যমে বাইকের রাইড ভাড়া করা যায়।। আজকাল মেয়েরাও ছেলেদের মত সমানতালে বাইক ভাড়া করে যাতায়াত করে।। দিপা আমাকে দেখে সেই বাইক ভাড়ার লোক মনে করে ফেলেছে।।

আমি চা খেতে খেতে বললাম- ঠিক আছে সমস্যা নেই, ইদানিং বাইক নিয়ে বেরুলেই এসব শুনতেই হয়, ব্যাপার না।। দেখুন আপনার বাইক মনে হয় এসে যাবে।।

দিপা একটু মৃদু হেসে, আমার সামনে থেকে সরে, ফুটপাতের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।। বার বার মোবাইল চেপে কি যেনো চেক দিচ্ছে, কিছুক্ষণ পর আমি দিপার চোখেমুখে হতাশা দেখতে পেলাম।। বাইক থেকে নেমে, চায়ের কাপ টঙ দোকানে রেখে আমি দিপার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললাম- কি রাইড ক্যান্সেল করে দিয়েছে নাকি??

দিপা আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললো- হ্যাঁ আগে খেয়াল করি নি, ক্যান্সেল করে দিয়েছে।। সমস্যা নেই, আমি দেখি আর কেউ আছে কিনা।।

কাওরানবাজার মোড়, রাস্তা সবসময় লোকে লোকারণ্য থাকে, তাই আমাদের কথাগুলো একটু জোরে জোরেই বলতে হয়।।

আমি চট্‌ করে বললাম- কই যাবেন, চলেন আমি আপনাকে নামিয়ে দেই।। যদিও আমার এসব এপ-ট্যাপের সাথে চুক্তি নেই তবে আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন।।

দিপা দ্বিধান্তিত, তবে ভীত না, মেয়েটা সম্ভবত ভাবছে।। আমি তাকে আরও একটু আশ্বস্ত করতে, পকেট থেকে আমার আইডি কার্ড বের করে বললাম- দেখুন টিভি চ্যানেলে কাজ করি, ভয় নেই।। তবে ফ্রি পৌঁছে দিবো না, টাকা কিন্তু ঠিকি নিবো।।

মেয়েটা এবার মুক্ত একটা হাসি দিলো, আমার এই বয়সে খুব কাছ থেকে মেয়েদের মুক্ত হাসি দেখলে বুকে ঘাঁই মারে।। আমি জোড়া ঘাঁই খেলাম- আপনি বিনা কারণে কেনো যাবেন, আপনার তো এপের সাথে নাকি চুক্তিও নাই, তাহলে শুধু আমি একটা মেয়ে জন্যে কি নিয়ে যেতে চাইছেন??

আমি মাথা নেড়ে বললাম- হুম, তাই ধরে নেন।। কারণ আমি টুকটাক লেখালেখি করি, অপরিচিত মেয়ে আমার বাইকে যেতে যেতে যদি কোন গল্প বলে দেয়।।

মেয়েটা এবার আমার দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকালো- নাম কি আপনার, আমি কি আপনাকে চিনি??

-না, অবশ্যই চিনেন না।। আমি ইদানিং কেবল ছাঁইপাশ লেখালেখি শুরু করেছি, আমার নাম শোভন।। আমার লেখা খুব বেশি লোকে পড়েও না, তবে একদিন হয়তো পড়বে।।

বাহ্‌, তবে চলুন আমাকে শ্যামলী দিয়ে আসুন!!

-শ্যামলী, আচ্ছা ঠিক আছে, আমার বাসা আগারগাঁও।। আর আমি এখন বাসার দিকেই যাবো, দেখছেন মাঝখান থেকে আপনার সাথে পরিচিত হলাম, প্লাস আমার কিছু টাকা কামাই হবে।। আজকে তো পুরাই লাভে লাভ।।

দিপা হাসছে, ইস্‌ মেয়েটা এমন করে হাসে কেন।। আমি চায়ের বিল দিয়ে দিপাকে নিয়ে শ্যামলী ছুটলাম।।

……………
দিপার সাথে আমার এখন নিয়মিত চ্যাট হয়, সেদিন শ্যামলী ওকে নামিয়ে দেবার পর, সে নিজেই আমার ফেসবুক আইডি চেয়ে নেয়।। সে নাকি আমার লেখা পড়বে, আমি খুব আগ্রহ নিয়ে তাকে ফেসবুক আইডি দেই, তারপর থেকে দু’জনের বেশ ভালোই চ্যাট হতে থাকে।। আমার ধারণা সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আমাদের এই পরিচয় প্রণয়ের সম্পর্কে গড়াতে সময় নিবে না।। আরও ভালো একটা ব্যাপার হলো, আমি যে সময় অফিস থেকে কাওরানবাজার হয়ে বাসায় আসি, সে সময় দিপার অফিস ছুটি।। আসার সময় আজ কয়েকদিন ধরেই মেয়েটাকে কাওরানবাজার থেকে রিসিভ করে বাসায় পৌঁছে দেই।।

আজকাল বেশ আনন্দ হয়, দিপা মেয়েটাকে আমার বেশ ভালো লাগতে শুরু করেছে।। তবে দিপার মধ্যে একটা ব্যাপার আমি খুব করে খেয়াল করেছি, মেয়েটা এই আছে বেশ হাসিখুশি আবার হুট করে চুপসে যায়।। আমার কাছে মনে হয় দিপার গোপন কোন কষ্ট আছে, কি সেই কষ্ট সেটা তো আর আচমকা জিজ্ঞেস করা যায় না।। তবে একদিন জেনে নিতে হবে, নিছক অভ্যাসবশত দিপা এমন চুপ করে যায়, নাকি সত্যিই আছে কোন ভিতরের কষ্ট।।

দিপার সাথে পরিচয়ের প্রায় দিন পনের পর, অফিসের একটা কাজে চট্টগ্রাম যাচ্ছি।। গাবতলী থেকে হানিফ বাসে উঠলাম, একটু শীত শীত ছিলো, তাই নন এসি বাসেই ভালো, রাতভর শুয়ে বসে আরামসে যাওয়া যাবে।। যে জিনিস আমি সবসময় মনে মনে চাইতাম, ঠিক তাই হলো, আমার বাসের পাশের সিটে একটা গড়পড়তা দেখতে মেয়ে বসলো।। আমি জানালার ধারে সিট পেয়েছি, মেয়েটা বাইরের দিকে।। এই সারারাত একটা মেয়ের সাথে জার্নি ভাবতেই অন্যরকম লাগছে।। মেয়েটা একটা পাতলা চাদর জড়িয়ে নিজের সিটে চুপচাপ বসে আছে, চেহারাটা অনেক বিষণ্ণ দেখাচ্ছে।। আমি শুরুতে কথা বলার ছুঁতো খুঁজলাম, ইদানিং লেখালেখি শুরু করাতে একটা বাজে স্বভাব পেয়ে বসেছে, কাউকে দেখলেই মনে হয় না জানি কত গল্প জমে আছে এই মানুষটার পেটে।। এই যে রাত সাড়ে এগারোটার বাসে আনুমানিক ২২-২৩ বছর বয়সের একটা মেয়ে বিষণ্ণ মনে একা একা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছে, নিশ্চয় এই মেয়েটার গল্প আছে।। কিন্তু কথা বলার জন্যে সুবিধা করতে পারলাম না।। বাস যখন মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের উপরে, মেয়েটা চট করে বললো- ভাই, ভাই আপনি এদিকে আসেন, আমার বমি আসছে, ভাই প্লিজ।।

আমি ধরফর করে উঠলাম, মানে কি, সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেলাম।। মেয়েটা সিট থেকে বের হলো, আমিও বের হলাম, তারপর সে ভিতরের সিটে ঢুকে গেলো।। আমি খুব আড়ষ্ট ভঙ্গিতে সিটে বসে পড়লাম, ধুর কি ভাবলাম আর কি হইলো, বাস ছাড়তে না ছাড়তেই বমি শুরু হয়ে গেলো এই মেয়ের।। এই মেয়ের পেটে তো গল্প নেই, আছে একগাদা বমি।। গাড়ির স্টাফ এগিয়ে এসে পলিথিন দিলো, মেয়েটা বেশ কিছুক্ষণ উটকি দিয়ে হয়তো বমি শেষ করে নিলো।। তারপর, ব্যাগ থেকে পানি বের করে খেয়ে, আমাকে বললো- সরি ভাই, আপনাকে অনেক অসুবিধায় ফেলে দিলাম।।

আমি উনার দিকে না তাকিয়েই বললাম- না ঠিকাছে, বমি আসতেই পারে, অনেকেরই যাত্রা পথে বমি হয়, তবে আজকাল মেডিসিন আছে তো, খেলে আর বমি হয় না।।

বলতে বলতে আমি আবার সোজা হয়ে সিটে বসলাম, এতক্ষণ মেয়েটার বমি কাণ্ডের কারণে একটু বাঁকা হয়ে বসে ছিলাম।।

মেয়েটা জবাব দিলো- আসলে আমার বাসে কখনোই বমি হয় না, ইনফ্যাক্ট আমি এসি বাস বা বিমানেই যাতায়াত করতাম।। কিন্তু…………

কিন্তু বলে মেয়েটা থেমে গেলো।। আমি একটু করে উনার দিকে তাকিয়ে বললাম- কিন্তু কি, কোন সমস্যা নাকি??

মেয়েটা আবার কেমন যেনো চুপসে গেছে।। আমি মেয়েটার বয়স ২২-২৩ অনুমান করেছিলাম, বমি করে চোখ মুখ এমন শুকিয়ে গেছে মেয়েটার বয়স এখন দেখাচ্ছে ত্রিশ বছরের নারীদের মত।। বার বার মনে হচ্ছে, মেয়েটা কি যেনো বলতে চায়, কি যেনো একটা ব্যাপার আছে।। গাড়ির ভিতরে আলো বন্ধ, তবে বাইরে থেকে আসা আলোতে আমি মাঝে মাঝে মেয়েটার মুখ বেশ স্পষ্ট দেখতে পাই, চোখ অনেকটা সয়ে গেছে।। মেয়েটা মাথা নিচু করা আছে।। আমি কাহিনী লোভী হয়ে গেছি, আবার তাগাদা দিলাম- কোন সমস্যা নাকি আপনার, কি করেন আপনি??

-আমি ভাই, ইষ্ট ওয়েষ্ট ইউনির্ভাসিটিতে পড়ি, আফতাবনগর।।

ও আচ্ছা, বাহ্‌ ভালো তো, চট্টগ্রাম কি আপনাদের বাড়ি, কিন্তু আপনার ভাষার মধ্যে কিন্তু কোন জড়তা নেই।।

-হুম, আসলে আমার বাবা সরকারী চাকুরী করতেন তো, তাই এদিক ওদিক ঘুরে শেষে চট্টগ্রাম স্যাটেল হয়েছে, তাই আমরা ভালোভাবেই কথা বলতে পারি।। আপনার বাড়ি কই??

আমার বাড়ি টাংগাইল, থাকি ঢাকাতে আর কি, একটা জব করছি।।

-আচ্ছা, আসলে বাসে এভাবে বমি হবার কারণ আমি প্রেগন্যান্ট, আমি পাঁচমাস হলো বেবি কনসিভ করেছি তবে বাইরে থেকে দেখে ওভাবে বোঝা যায় না।।

আমি আঁতকে উঠলাম, কি হলো, পাঁচ মাসের একটা বেবি পেটে নিয়ে মেয়েটা একা একা রাতের বাসে চট্টগ্রাম যাচ্ছে।। আমি এবার ভালো করে মেয়েটার দিকে তাকালাম, অন্ধকারের আলো আঁধারির সাথে দ্রুত ছুটে চলা বাসের গতিতে আমি মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণ করলাম, বেশ আধুনিক পোশাক পরা, দেখে মনে হয় উচ্চবিত্ত না হলেও কোন অংশে কম না।। অস্ফুট কণ্ঠে বললাম- আপনি তবে এই অবস্থায় একা যাচ্ছেন যে??

মেয়েটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, একটু করে আমার দিকে তাকিয়ে আবার মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললো- ভাই আমি একাই, আমার কেউ নেই।। আমার পেটে যে বাবুটা হচ্ছে, আমি ছাড়া ওরও কেউ নেই।।

আমি নড়েচড়ে বসলাম, মেয়েটার প্রতি আমার কোন মায়া হচ্ছে কিনা জানি না, কিন্তু মনে মনে ভাবছি, নিশ্চয় নতুন কোন গল্প পেতে যাচ্ছি, আমার চোখ চকচক করে উঠলো।।

আমি বললাম- ইয়ে মানে, আপনার হাজব্যান্ড কি মারা গেছেন??

মেয়েটা একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বললো- আমার হাজব্যান্ড ছিলোই না কোনদিন।।

আমি এবার বিষম খেলাম, নাহ্‌ মেয়েটা কি আমাকে বোকা বানাচ্ছে।। এ আবার নতুন কোন ধোঁকাবাজ পার্টি না তো, উল্টাপাল্টা কাহিনী বলে ভড়কে দিয়ে ধান্ধা করবে নতুন নতুন।। আমি বেশ সতর্ক হয়ে গেলাম, আস্তে করে জিজ্ঞেস করলাম- মানে বুঝলাম না, একটু খুলে বলবেন সব।।

-ভাই খুলে বলার কিছু নাই, অনেক লম্বা ঘটনা।। আপনি শুনে কি করবেন, এই বাচ্চাটা না থাকলে আমি এতদিনে আত্মহত্যা করতাম জানেন ভাই।।

আমি কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না, কোনমতে প্রসঙ্গ ঘুরাতে বললাম- না মানে, সত্যি বলতে কি আপনার নাম জানা হয় নাই, নামটা বলেন, আপনাকে একটা কথা বলবো।।

-আমার নাম আনিকা, আপনার??

আমি শোভন, শুনেন আনিকা আমি না গল্প লেখি টুকটাক।। আমি আপনার গল্প শুনতে আগ্রহী।।

মেয়েটা আমার দিকে ঘুরে তাকালো, কেমন যেনো বিচক্ষণ চোখে আমাকে পরখ করে নিচ্ছে।। আমি একটু বিব্রত হয়ে চোখ নামিয়ে নিলাম।। তারপর আনিকা বললো- আচ্ছা, ক্রিয়েটিভ লোকজন, আমি তো আবার ক্রিয়েটিভ লোকজন ভয় পাই বুঝলেন।।

আমি জবাব দিলাম- না ক্রিয়েটিভ না, এমনি আর কি টুকটাক লিখি।। আপনি বলেন না, বাসে যেতে যেতে গল্প কি শেষ হবে না।। বলুন আমি শুনবো।।

মেয়েটা দম নিলো, বেশ লম্বা করে দম নিলো, তারপর আমার দিকে একটু ঝুঁকে বলতে শুরু করলো- আমার বাসা রামপুরা বনশ্রী ছিলো, আমি তো বলেছি ইষ্ট-ওয়েষ্টে পড়ি মানে আসলে পড়তাম।। তো বিন্দাস লাইফ, বাসা থেকে টাকা পাঠায় ভার্সিটি যাই একদম ফ্রি স্ট্যাইলে চলাফেরা করি কোন সমস্যা নেই।। এমন সময় এক বান্ধবীর মাধ্যমে পরিচয় হয় এক লোকের সাথে।। লোকটা বেশ ক্রিয়েটিভ, কি সুন্দর যে ছবি আঁকে ভাই আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না, আবার সুন্দর গান গায়।। লোকটার বয়স মনে করেন, ৪০ এর মত তো হবেই।।

আমি মাঝে বললাম- আচ্ছা, পরে।।

-পরে আর কি, তার সাথে পরিচয়, ফেসবুকে তার আঁকা ছবি দেখি।। গান গেয়ে আপলোড করে। আমার ভালোলাগে, আস্তে আস্তে পরে অনুভব করি তাকেই ভালো লাগতে শুরু করে।। সেও সুযোগ পেলে আমার সাথে ফোনে কথা বলে, গান শুনায়, আমাদের মধ্যে ভালো একটা ফ্রেন্ডশিপ বিল্ডাপ হয়।। আসলে আমার বয়স কম ছিলো তো, কেবল ঢাকা গেছি, কেমন যেনো ওকে আপন আপন লাগা শুরু হয়।।

আমি আবার মাঝে বলে উঠলাম- উনি কি অবিবাহিত ছিলেন নাকি??

-না ভাই, সে বিবাহিত ছিলো।। দুইটা ছেলের বাপ ছিলো।। কিন্তু তারপরেও আমার ভালো লাগতে থাকে।। এরমধ্যে সে তার বউকে সন্দেহ করতো যে তার বউয়ের অন্য কোথাও পরকীয়া আছে।। মানে এক্স বিএফ এর সাথে কিছু একটা করে।। এগুলো আমাকে বলতো আর আফসোস করতো, এগুলো শুনে আমার খুব মায়া লাগতো।। ভাই সে যে কি সুন্দর গুছিয়ে কথা বলতে পারে, কোথাকার কি কাব্য কবিতা লাইন দিয়ে আপনাকে পুরো সম্মোহিত করে ফেলতে পারবে।। আপনি যাস্ট তার জন্যে পাগল হয়ে যাবেন, যেটা আসলে আমি হইছিলাম।। তো এইসব পরকীয়া-টিয়া নিয়ে সে তার বউয়ের সাথে ডিভোর্স করে ফেলে।। আমি না মনে মনে তখন খুশি হয়ে যাই।। আচ্ছা আমি ওর নাম বলি নাই, ওর নাম জামান।। তো জামানের ডিভোর্সের পর, আমিই ওকে সময় দিতাম, ফোনে কথা বলতাম।। একদিন জামান আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বসে, আমি না ভাই কেমনে জানি রাজি হয়ে যাই।। যেখানে আমার নিজের বাবার বয়স ৪৮ এর মত, সেখানে আমি জামানের প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ফেলি।।

আচ্ছা, পরে!!

-পরে ভাই, জামান বলে তুমি আমার বাসায় এসে থাকো।। অযথা বনশ্রী থাকার দরকার কি, আমি তো একাই আছি, আমার সাথে কেউ নাই।। তুমি একটু রান্না করবা দু’জন মিলে খাবো এই তো।। ভাই শুরুতে আমি রাজী হই নাই, পরে সে কি সব বুঝালো আমি আর না করতে পারি নাই।। আমি চলে যাই ওর সাথে থাকার জন্যে ওর বাসায়, ও নতুন একটা বাসা ভাড়া নেয় উলন রোডে, স্বামী স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে আমরা সেই বাসায় উঠি।। তারপর শুরুতে ক’দিন ভালোই যায়।।

আমি আনিকাকে থামিয়ে দিয়ে বলি- আপনারা বিয়ে করেন নাই, তখনো??

-না ভাই, আমি তো হিন্দু।। জামান বলতো কিভাবে বিয়ে করবো, আর এখন বিয়ে করলে ওর ঝামেলা হবে, কারণ আপনাকে তো বলা হয় নাই, ওর বউ ওর নামে খরপোষের মামলা করে দিছে, তাই বিয়ে করলে জামানের ঝামেলা হতো।।

আমি নির্বাক হয়ে গেছি মেয়েটার কথা শুনে, মেয়েটা হিন্দু।। আমি বিস্ময় চোখে মেয়েটার দিকে তাকালাম, সত্যিই এখন মেয়েটাকে হিন্দু হিন্দু লাগছে।। আমাদের দেশে একটা অদ্ভুত প্রচলন আছে, চেহারায় নাকি অনেক সময় হিন্দু হিন্দু ভাব ফুটে উঠে, আমি এই কথাটা অনেকের কাছেই শুনেছি কিন্তু নিজে কখনো এমন করে প্রমাণ পাই নি।। মেয়েটার কথা শুনেই সত্যিই এখন তাকে আমার হিন্দু বলেই মনে হচ্ছে।। আমি কাহিনী কিছুটা আঁচ করতে পারছি, নিজের মত করে কাহিনী সাজানো শেষ আমার, বলুক তবু মেয়েটা।।

-তো ভাই, জামানের সাথে থাকি, আস্তে আস্তে ভার্সিটিতে অনিয়মিত হতে থাকলাম, আমি ভাবতাম ওর আঁকা ছবি, গান আমি এসব নিয়ে দিব্যি ভালো থাকতে পারবো, কিন্তু ভাইরে বাস্তবতা তা না, কিছুদিন পর আমার পেটে বাচ্চা চলে আসে।। আমি ওকে জানালাম, ও আমাকে সাথে সাথে এবোরশন করাতে বলে।। আমি তো পুরাই না করি, না আমি বাচ্চা এবোরশন করবো না, বলি তুমি আমাকে বিয়ে করো।। না সে করবে না, এই নিয়ে সে আমার গায়ে হাত তুলা শুরু করে।। ভাই কিসের গান কিসের কবিতা কিসের ছবি আঁকা, সব মিথ্যা, আমার জীবনটা যাস্ট নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিলো।। কিন্তু আমি বাচ্চা এবোরশন করবো না ব্যাস, আমাকে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইছে।। অনেক মাইর খাইছি ভাই, আমার তো যাবার জায়গা নাই আমি কি করবো বলেন, আমি ওখানেই ছিলাম সব নির্যাতন সহ্য করে।। একদিন কেন জানি মনে হয় মাইর খেতে খেতেই কিনা, আমার বেবি মিসকারেজ হয়, একটা মাংসপিন্ডের দলা বের হয়।। আমি হাউমাউ করে কান্না করি রে ভাই, আর জামান আমাকে বলে, ওই কুত্তার বাচ্চা কান্না বন্ধ করে ঘুমা মাগী, আমার সকালে অফিস আছে।। ভাই বিশ্বাস করেন, তারপর ওই অমানুষটা সেই মাংসের দলাটাকে লাত্থি দিতে দিতে বাইরে ময়লার বালতিতে রেখে আসে।। আমি শুধু ভাবতেছিলাম, হায়রে ছবি আঁকা রে, হায়রে আমার গানের শিল্পী রে, এই তবে আসল রূপ।। পরে ভাই আরেকটা মাংসের দলা বের হয়, আসলে জমজ বাচ্চা ছিলো।। জানেন ভাই, আমি না জামানরে লুকাইয়া ঐ দলাটা পলিথিনে করে অনেক দিন ফ্রিজে রাইখা দিছিলাম।। ভাই প্রথমবার মা হতে যাচ্ছিলাম, আমার যে কি কষ্ট লাগছে আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না।।

আনিকার চোখে পানি টলটল করছে, এমন সময় আমার কল আসলো, দিপার কল।। আমি কিছুক্ষণ ওর সাথে কথা বললাম, মাঝে চেকার এসে টিকেট চেক করে গেছে।। বাস কুমিল্লা তাজমহল হোটেলে বিরতি নিলো।।

আমি আনিকাকে জিজ্ঞেস করলাম, সে বাস থেকে নামবে কিনা?? কিছু খাবে কিনা?? আনিকা না করে দিলো, সে বাসেই থাকবে, আর কিছু খাবে না, খেলেই নাকি তার বমি হবে।। তবে সে একবার নেমে ওয়াশরুমে গিয়েছিলো মনে হয়।।

বাস আবার ছাড়লো, আনিকা জানালার পাশের সিটে চুপচাপ বসে আছে।। আনিকার পেটে বাচ্চা, বাচ্চার বয়স পাঁচ মাস, আগের বাচ্চা মিসকারেজ হলে এখনের বাচ্চাটা কার।। আমার জানতে মন চাচ্ছে, কিন্তু কুমিল্লা থেকে বাস ছাড়ার পর, আনিকা আবার চুপচাপ, চোখ বুজে আছে।।

খানিকবাদে আনিকা আমার দিকে তাকালো, আমিও চট করে তাকে সায় দিলাম- ভাই আমার গল্পটা শেষ হয় নাই, বলবো কি??

আমি হন্তদন্ত হয়ে- হুম অবশ্যই, বলুন, আমি পুরোটা শুনতে চাই।।

আমি এই বাক্য বলে, মনে মনে ভাবছি, আমি কি অতি উৎসাহ দেখাচ্ছি নাকি!!

আনিকা বলতে শুরু করলো- ভাই, কই যেনো ছিলাম??

আমি চট মনে স্মরণ করিয়ে দিলাম- আপন ওই যে বললেন, জমজ বাচ্চা মিস কারেজ হলো যে।।

-আচ্ছা আচ্ছা, পরে ভাই মিসকারেজ হওয়াতে জামান খুব খুশি।। আমাকে অনেক বুঝালো সব আগের মতই চললো।। এরমধ্যে ভাই আমার বাসা থেকে ভার্সিটির টিউশন ফি আসে, সব জামানের হাতে তুলে দেই, কিন্তু আমার কিন্তু পড়াশোনা বন্ধ।। জামান জব ছেড়ে দিলো, ওদিকে ওর মামলার কারণে ওর প্রচুর টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে, মাঝে ওকে জেলে যেতে হইলো ওর বউয়ের মামলায়।। আমি ওই ক’দিন বাসায় চলে গেলাম, বাসায় মানে চট্টগ্রাম আমাদের বাসায়।। পরে ছাড়া পাইলে আমি আবার চলে আসি।। আবার এই মিথ্যে সংসার শুরু হয়, ভাই আমি না একটা মোহে পড়ে গেছিলাম।। কতবার সে ছলনা করে, মিথ্যে বলে গরগর করে কিন্তু না কিভাবে যেনো আমাকে ম্যানেজ করে ফেলে, তাই তো ভাই আমি এইসব ক্রিয়েটিভ লোক দেখলে মুচকি হাসি।। পরে ভাই, সে আমাকে মানে আবার আমার বেবি হয় পেটে, এই বেবিটা আর কি।।

আমার আনিকার গল্প শুনতে শুনতে মনে হচ্ছে, কি বিশ্রী এক জীবনের গল্প।। না আছে বিয়ে, না আছে ধর্মের মিল, একটার পর একটা বাচ্চা বাঁধিয়ে যাচ্ছে।। আচ্ছা ওই মধ্যবয়স্ক লোকটা কি এমন গান গায়, কি এমন ছবি আঁকে যে এমন আধুনিক মেয়েও তার ধুম্রজাল থেকে বেরুতে পারছে না।।

আনিকা বলে যাচ্ছে- তো আমি ভাই, এই বেবির ব্যাপারটা লুকাই।। যাতে ও না বুঝতে পারে, প্রায় চারমাসের মাথায় আমি ধরা খেয়ে যাই।। ও আমাকে মেরে রক্তাক্ত করে ফেলে, আমাকে আবার মেরে মেরে একপ্রকার জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।। কিন্তু হাসপাতাল থেকে না করে দেয়, এই বেবি এবোরশন করানো যাবে না, কারণ তিন মাসের উপরে হলে এবোরশন করানো যায় না।। আমি তো শুনে খুশি হয়ে গেলাম, ভগবানের কাছে আর্জি করলাম, আমার এই বাচ্চা যেনো বাঁচে।। জামানের খুব রাগ উঠে গেলো, আজ এক মাস ধরে আমার এই বাচ্চাটাকে মেরে ফেলার জন্যে সে আকুলি বিকুলি করতেছে।। তাই পেটের এই বাচ্চা নিয়ে আমি একপ্রকার পালিয়েই চলে এসেছি, যাবো নিজের বাড়িতে জানি না সেখানে আমাকে আশ্রয় দিবে কিনা, কি আছে কপালে!!

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম, তবে ভিতরে ভিতরে অদ্ভুত একটা আনন্দ আছে, ভালো একটা গল্প শুনলাম, কাজে দিবে- আচ্ছা, চট্টগ্রামে আপনাদের বাসায় কে কে থাকেন, আপনার বাবা-মা সবাই বেঁচে আছেন।।

-হুম ভাই, আব্বু আম্মু আছে, আর আমার এক বড় ভাই।। আমরা এক ভাই এক বোন।।

আচ্ছা!!

কিছুক্ষণের জন্যে আমাদের কথা থেমে আছে।। আবার, দিপার কল চলে এসেছে, মেয়েটার রাত জেগে আমার নিরাপদ জার্নির খোঁজ নিচ্ছে।। আমাদের মধ্যে প্রেম হবে হবে ভাব, কাউকে ভালোবাসি বলা হয় নি, কিন্তু কেনো যেনো মনে হচ্ছে দ্রুতই হয়ে যাবে।।

আনিকা আমার আগেই সীতাকুন্ড নেমে গেছে, আমার গন্তব্য অলংকার মোড়।। যাবার আগে খুব করে মন চাচ্ছিলো, মেয়েটার কোন কন্টাক্ট নাম্বার রেখে দেই, অন্তত বাবুটার কি হয় সেটা জানার জন্যে হলেও।। কিন্তু কেনো যেন জড়তার কারণে বলতে পারি নি, আচ্ছা আনিকাকে যদি পরিবার গ্রহণ না করে তবে কেমন হবে।। আচ্ছা, মেয়েটা বাসায় গিয়ে কি বলবে, আমি বিয়ে করেছি, আমার পেটে বাচ্চা, এসব!! আনিকাকে যদি জিজ্ঞেস করে, জামাই কই, জামাই কি করে!! মেয়েটা কি জবাব দিবে।। আচ্ছা এই যে বিয়ে ছাড়া আনিকার গর্ভে একটা মুসলমানের বাচ্চা এলো, এই বাচ্চাটারই বা ধর্ম কি।। যাচ্ছে তো হিন্দু বাড়িতে, কি হবে এই বাচ্চার ভবিষ্যৎ।। আসলে যতক্ষণ আনিকা পাশে ছিলো, আনিকাকে শুধুই একটা অন্যরকম গল্পের সারথি মনে হচ্ছিলো, কিন্তু সে নেমে যাবার পর তার জন্যে মায়া হচ্ছে, চিন্তা হচ্ছে।।

জীবন এত অদ্ভুত কেনো, একেক মানুষের একেক রকম গল্প। এই মেয়েটা যদি আমাকে বলে, ভাই আমার জীবনের সমাধান কি, আমি কি জবাব দিবো।। মেয়েটা নিঃসন্দেহে খুব বাজে কাজ করেছে, নোংরা কাজ কিন্তু ওই যে ক্রিয়েটিভ লোকটা, তার কি দায় নেই।। দেখা যাবে লম্বা চুলে বিশাল কোন এক ভক্ত বাহিনী নিয়ে বসে আছে লোকটা, অথচ ভিতরটা একদম ফাঁপা, কুৎসিত।। আচ্ছা আমার যদি কখনো নাম-ডাক হয় আমিও কি এমন হয়ে যাবো, নারী লোভী ফায়দা লুটেরা বাজে কোন মানুষ!! কে জানে, সময় বলে দিবে, তবে আনিকার কষ্ট দেখে এমন হবার ইচ্ছে মনে হয় চিরতরে উবে গেছে।।

..……………
আমার লেখালেখি বেশ ছড়িয়ে পড়েছে, দিপার সাথে পুরোদমে প্রেম চলছে।। আনিকার গল্পটা লেখা হয় নি, জমিয়ে রেখেছি কারণ আনিকার খোঁজ পেলে, পরে একদিন লিখবো।। আমার মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে হয় ওই জামান ব্যাটাকে একটা শাস্তি দিতে, কিন্তু কতদূর কি পারবো জানি না।। মুখোশের আড়ালে কথিত ক্রিয়েটিভ লোকদের মুখোশ খুলে দিতে পারলে, আমাদের মেয়েগুলো সতর্ক হতো।। মেয়েরা এটা কেন বুঝে না সে যদি কারও ক্রিয়েটিভিটি দেখে পাগল হয়, তাহলে তার মত অনেকেই তো হতে পারে।। আর সে যদি কাউকে গ্রহণ করে, সে হয়তো আগেও এমন অনেককেই গ্রহণ করেছে।। উহু, এই জন্যেই তো দুই দিন পর পর সেলিব্রেটিদের স্ক্যান্ডেল বের হয়।। আচ্ছা আনিকাকে ইউজ করা লোকটা কে, আমার জানতে মন চাচ্ছে।। দেখা গেলো বেশ জানাশোনা পরিচিত কোন চিত্রকর, যার ছবি আঁকা দেখে অবাক চোখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম।। এখন দেখলে হয়তো সেই ছবিগুলোর প্রতি ঘৃণা ফুটে উঠবে, আবার নাও উঠতে পারে, তার ব্যক্তিগত জীবন তার, সৃষ্টি বা শিল্পকর্ম কি দোষ করলো।। আচ্ছা নাম জামান, খোঁজ নিয়ে দেখা যেতে পারে।। চট্টগ্রাম কাজের পঅর্ব চুকিয়ে বেশ ভালোভাবেই ঢাকা ফিরে এলাম।।

বলছিলাম দিপার কথা, দিপার মধ্যে আমি রোদ মেঘ একসাথে দেখতে পাই।। মেয়েটা এই প্রাণবন্ত আবার হঠাৎই চুপচাপ, এমন কেনো হয় কে জানে!! আর কিছুদিন পর দিপার জন্মদিন, দিপার অতীত জীবন সম্পর্কে আলাপের তালে তালে অনেক কিছু জানতে চেয়েছি, কিন্তু সে খুব চাপা, তেমন কিছুই বলে না।। এই যে দিপার প্রায় ২৪-২৫ বছর বয়স, নিশ্চয় এর মধ্যে ওর প্রেম এসেছে, কাউকে ভালোবেসেছে, কিভাবে কি এসব তো জানার আগ্রহ হয়।। আমি আমার অতীতের ছোটখাটো সব কথা বলে দিয়েছি, কিন্তু প্রচণ্ড আগ্রহ থাকার পরেও দিপারগুলো শোনা হয় নি।।

দিপারা তিন বোন, ভাই নেই।। দিপা মেঝো, বড় বোনের বিয়ে হয়েছে, জামাই নিয়ে শ্যামলীতে থাকে দিপাদের বাসার কাছেই, উনাদের একটা মেয়ে আছে ৩ বছরের।। দিপার ছোট বোন পড়ে জগন্নাথ ইউনিভার্সিটিতে।। ওদের বাবা বাংলাদেশ ব্যাংকে জব করে, মা গৃহিনী।। দিপাকে বার বার জন্মদিন নিয়ে প্রশ্ন করি, সে কি জন্মদিনে আমাকে ওদের বাসায় দাওয়াত দিবে কিনা, দিপা জন্মদিনের ব্যাপার নিয়ে আলাপ করতে আগ্রহ পায় না।। কি অদ্ভুত, কেন আগ্রহ পায় না কে জানে!!

দিপার জন্মদিনের দিন রাত ১২ টায় কল করে উইশ করলাম, অনেকক্ষণ কথা বললাম, পরের দিন আমাদের দেখা হবে।। আমি অফিস ম্যানেজ করে নিয়েছি, বিকেলে দু’জন ডেট করবো।।

সকালে ঘুম থেকে উঠে দুইবার ফোন দিলাম, দিপা ধরে বললো, ওর নাকি শরীর খারাপ সে বিকেলে বের হতে চাচ্ছে না, অন্যদিন বের হবে।। আমার প্রচণ্ড মন খারাপ হয়ে গেলো, এটা কি হলো।। পুরো দিনটাই মাটি হয়ে যাবে, ওর জন্যে আমি নীল শাড়ি আর চুড়ি কিনে রেখেছিলাম জন্মদিনের গিফট্‌ উপলক্ষ্যে অথচ এই জিনিস আজকে না দিলে কোন মজাই থাকবে না, ধুর পুরো মেজাজটাই খারাপ করে দিলো, কিন্তু অসুখের উপর তো কারও হাত নাই, আমি ধৈর্য্য ধরলাম।।

বিকেলে দিপাকে কল দিয়ে আবার খোঁজ নিলাম, না সে বলে সে অনেক অসুস্থ, কিছুতেই বেরুতে পারবে না।। আমি আশা ছেড়ে দিলাম, বিরস বদনে বাসায় বসে রইলাম।।

রাতে কল দিচ্ছি, দিপা ফোন ধরে না।। ধরে না যে ধরেই না, অনেকগুলো কল দিলাম, পরে বাধ্য হয়ে ওর ছোট বোন নিপার নাম্বার ছিলো, ওকে কল দিলাম।। নিপা যা শুনালো তা শোনার জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না।। দিপা নাকি আত্মহত্যা করেছে, রুমের ভিতরে দরজা লাগিয়ে ফ্যানের সাথে ওড়না বেঁধে গলায় ফাঁস নিয়েছে।। আমি অবিশ্বাস্য রকম কেঁপে উঠলাম, এটা কিভাবে কি হলো।। নিপা কথা না বাড়িয়ে ফোন রেখে দিলো, লাশ নাকি মেডিকেলের মর্গে নিয়ে যাচ্ছে, পুলিশ এসেছে।। যা তা অবস্থা!! আমি কিছুতেই বুঝতে পারলাম না, দিপার হলো কি, এভাবে সে কেনো আত্মহত্যা করলো।। আমি নিপাকে বার বার কল দিচ্ছি, এই ভেবে যে আমি কি মেডিকেলের মর্গে যাবো কিনা, কিন্তু নিপা কল রিসিভ করছে না।। হয়তো ব্যস্ত আছে, মরা বাড়িতে ব্যস্ততা অস্বাভাবিক কিছু না।। সেদিন সারারাত অনেকবার কল দিলাম, নিপা ফোন রিসিভ করে নি, পরে দেখলাম নাম্বার বন্ধ হয়ে আছে।। ছটফট করে আমার সারারাত গেলো, দিপাদের বাসা আমি পুরোপুরি চিনি না, তবে বাসার কাছাকাছি জায়গা চিনি।। দিপার ফেসবুক ঘেঁটে ওর কিছু বান্ধবীর আইডিতে রাতে নক দিয়েছি, কেউ এখনো সাড়া দেয় নি।। একটা বিভীষিকাময় চিন্তার রাত গেলো আমার, পরের দিন সকালে ওর এক বান্ধবী বাঁধন আমাকে ম্যাসেঞ্জারে রিপ্লাই দিলো।। আমি বাঁধনের কাছে উনার নাম্বার চেয়ে উনাকে কল দিলাম, সব জানতে চাইলাম।।

বাঁধন জানালো, দিপা নাকি অভিমান করে আত্মহত্যা করেছে।। আর অভিমান হলো, ওর বাবা মা নাকি ওকে বার্থডে উইশ করে নি, কেনো ওর বাবা মায়ের এটা মনে ছিলো না তাই সে নাকি একটা সুইসাইড নোটে এমন কিছু লিখে আত্মহত্যা করেছে।। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম, অনার্স মাস্টার্স শেষ করে জব করা একটা মেয়ে এই কারনে আত্মহত্যা করবে, এ কথা তো পাগলেও বিশ্বাস করবে না।। নিশ্চয় বড় কোন ঘাপলা আছে, কি সেই ঘাপলা, আমার তো ওর পরিবারের লোকজনকেই সন্দেহ হচ্ছে, দেখা যাক পোস্টমর্টাম রিপোর্টে কি আসে।।

দুইটা দিন কেটে গেলে খুব মনমরা অবস্থায়।। বার বার দিপার কথা মনে হতে থাকলো, কি এক রহস্যময় মৃত্যু মেয়েটাকে বরণ করতে হলো।। এদিকে দিপার ছোট বোন নিপার সাথে কথা হয়েছে, মেয়েটাও বলেছে, দিপা নাকি এই অভিমানেই আত্মহত্যা করেছে।। আমি নিপাকে বললাম, তুমি এটা কিভাবে বিশ্বাস করো, একজন চাকুরীজীবি মেয়ে বাবা-মা বার্থডে উইশ না করাতে সুইসাইড করবে।। নিপা কথা বাড়ায় না, দায়সারা ভাবে দুই’এক কথা বলে ফোন রেখে দেয়।।

ভয়ংকর ঘটনা ঘটলো যখন দারুস সালাম থানা থেকে আমাকে একজন এসআই থানায় গিয়ে দেখা করতে বললো!! কারণ প্রাথমিকভাবে ভাবে ডাক্তার দিপার লাশের ময়না তদন্তে পেয়েছে, মেয়েটা নাকি প্রেগন্যান্ট ছিলো, আর তাই বয়ফ্রেন্ড হিসেবে সন্দেহের তীর আমার দিকেই।।

অথচ আমি তো দিপাকে………………………।।

…………………
চলবে-

প্রথম পর্ব-

  • সাহিত্যলিপি

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © Ctgcampus.com