Chat with us, powered by LiveChat
Home / অন্যান্য / কলাম / গণতন্ত্রের জয় হোক

গণতন্ত্রের জয় হোক

শেয়ার করুন ...
20Shares

দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে এই ডিসেম্বরে আমরা  স্বাধীনতা পেয়েছিলাম। নিঃসন্দেহে আমরা বীরের জাতি।  আজ আমরা স্বাধীন বটে। কিন্তু সেদিনের মুক্তি কামী জনতারা শুধুমাত্র ভৌগোলিক স্বাধীনতার জন্যই জীবন দেননি। তার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সর্ব ক্ষেত্রে স্বাধীনতা। যা দেশ স্বাধীনের এতো বছর পরেও আমরা আজো পাইনি।

আমরা  আমাদের রাজনীতিবীদদের এবং দেশবাসীর মুখ থেকে ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি হরহামেশায় শুনতে পাই।গণতন্ত্রকে আমরা আমাদের প্রিয় দেশের জনগণের অধিকার রক্ষার একমাত্র অবলম্বন বলে মনে করি। কিন্তু এটি আসলেই চিন্তার ব্যাপার যে, গণতন্ত্র আসলে কি তা আমরা কতটুকু বুঝি। এটি আমাদেরকে স্বাধীনতা দেয়, কিন্তু সমাজ ও দেশের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত করে না।
গণতন্ত্রকে মূলত একটি সরকার ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। যেখানে নাগরিকেরা সরাসরি ক্ষমতা ব্যবহার করে অথবা প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদরূপে একটি পরিচালনা পর্ষদ তৈরি করে। কখনও কখনও গণতন্ত্রকে ‘সংখ্যাগুরুর শাসন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

গণতন্ত্রে কিছু মৌলিক দিক রয়েছে- সরকার, সংসদ ও আদালতের মধ্যে ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ, মতামত, ভাষ্য, সংবাদমাধ্যম ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাধারণ ও গণভোটের অধিকার এবং সুশাসন। বর্তমান অবস্থা থেকে এটা দৃশ্যমান যে, গণতন্ত্রের আসল মানে আমরা কেউই জানি না। আমাদের দেশবাসীরা গণতন্ত্রকে শুধুমাত্র তাদের ভোটের অধিকার হিসেবেই বুঝে যদিও তা আরও অনেক বেশী কিছু বোঝায়। আমাদের রাজনীতিকরা গণতন্ত্রকে তাদের সরকারের ক্ষমতায় আসার একটি পন্থা হিসেবেই মনে করেন। কিন্তু এটিকে অবশ্যই আমাদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করতে হবে- শুধুমাত্র ধনী ও ক্ষমতাবানদের অধিকার নয় বরং সাধারণ মানুষের অধিকারও। আমাদের অবশ্যই মত প্রকাশের অধিকার এবং ধর্ম ও সংস্কৃতির সাপেক্ষে স্বাধীনতা থাকতে হবে। কিন্তু বাস্তবে, আমরা টেকসই গণতন্ত্র সমন্ধে খুব কমই জানি। আমাদের এই না জানার পেছনে অন্যতম কারণ আমাদের অজ্ঞতা। আমরা লিখতে পড়তে হয়তো অনেকেই পারি, কিন্তু আমাদের অধিকার এবং তা প্রয়োগের ব্যবহার সম্পর্কে বেশিরভাগ লোকই অজ্ঞ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, যদি কোন ব্যক্তি একটি মাত্র বর্ণ লিখতে পারে, তবে তাকে শিক্ষিত হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এবং ২০১৬ সালে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে শিক্ষার হার ৭২.৩% হিসাব করা হয় যাদের মধ্যে বেশিরভাগই এবং বয়স্ক লোকজন কেনল স্বাক্ষর করে নিজের নামটাই কোনরকমে লিখতে পারতো। ইউনেস্কোর মতে, শিক্ষিত হতে হলে তিনটি জিনিস অবশ্যই থাকতে হবে- পড়তে পারা, লিখতে পারা এবং সাধারণ অঙ্ক করতে পারা। এটিই সারা বিশ্বে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু ২০১৬ সালের প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার রিপোর্ট তৈরি করার সময় ইউনেস্কোর এই ব্যাখ্যাকে বিবেচনা করা হয়নি।

ইউনেস্কোর ব্যাখ্যানুযায়ী, আমরা ধারণা করতে পারি যে, বাংলাদেশে শিক্ষার সত্যিকার হার ৫০ শতাংশও হবে না। যেহেতু এই তথাকথিত শিক্ষিতদের অনেকেই পড়তে ও লিখতে জানে না তাই, গণতান্ত্রিক অধিকারের বিষয়ে শেখার জন্য দরকারি তথ্য তারা খুঁজে পায় না অথবা পড়তে পারে না।

আমাদের রাজনীতির ইতিহাস ১৯৪৯ সালে পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের গোঁড়াপত্তনের মাধ্যমে শুরু হয়েছিলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই দলটি পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ সংগ্রাম করে গেছে যদিও এই অঞ্চলটি ধনী কিন্তু সংখ্যালঘু পশ্চিম পাকিস্তান দ্বারা শোষিত হতো। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী নানা দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তানীদের দমন করে রাখতো। যেমন: রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, অর্থনীতি এবং ভাষা। যখন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তখন পুরো পূর্ব পাকিস্তান বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে যা থেকে ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। অনেকে শহীদ হন এবং শেষ পর্যন্ত বাংলা যা পাকিস্তানের বেশীরভাগ নাগরিকের মুখের ভাষা, পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অধিকার নিশ্চিতকরণে ছয়দফা আন্দোলনের ঘোষণা করেন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে, আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বৃহত্তর স্বায়ত্বশাসনের দাবীর উপর ভিত্তি করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেন। একই সময়ে জুলফিকার আলী ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেন। মুজিব জয় লাভ করার পরেও পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী তাঁকে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বঞ্চিত করে। এই সকল বৈষম্যই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করে যা আমাদেরকে স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশী হিসেবে একটি নতুন পরিচিতি এনে দেয়। এই সকল আন্দোলন, বিদ্রোহ, বিক্ষোভ এবং যুদ্ধ ছিল শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়নের ফসল। সাধারণ মানুষ যুক্তি দিয়ে নয় বরং আবেগ দ্বারাই চালিত হচ্ছিল। সেই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষার হার মাত্র ২০ শতাংশের মতো ছিল। বঙ্গবন্ধুর দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতৃত্বই ছিল তাদের একমাত্র আশার আলো এবং তাঁর বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞাই আমাদেরকে আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল।

৭১’র স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে ১০টি জাতীয় নির্বাচন সংঘটিত হয়েছে এবং এর মধ্যে ৭টি নির্বাচন গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের উদ্দেশ্যে সংঘঠিত হয়। ১৯৭৫ পরবর্তী সময় থেকে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বৈরাচারী সামরিক শাসক দ্বারা পরিচালিত হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সত্যিকার গণতন্ত্র নেই কারণ শিক্ষার অভাবে আমাদের গণতন্ত্র সমন্ধে সঠিক ধারণাই নেই। ১৯৭৯ এর নির্বাচনের সময়ে শিক্ষার হার মাত্র ২৯ শতাংশ এবং ১৯৯১ এর নির্বাচনের সময় তা ৩৫.৩ শতাংশ ছিল।

১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে আমরা শিক্ষা ও তার বাজেটের উপরে খুব কম গুরুত্ব আরোপ করেছি। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারেও শিক্ষার হার বৃদ্ধি করাকে গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে এবং শিক্ষার হার ২০০৯ সালে ৪৬ শতাংশ হতে ২০১৭ সালে ৭২.৩ শতাংশ উন্নীত হয়েছে। যদিও তিনি ২০০৯ সালের বিশ্ব স্বাক্ষরতা দিবসে ২০১৪ সালের মধ্যে শিক্ষার হারকে শতভাগে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, আমরা এখনও সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারিনি।

আর মাত্র দুই দিন পরেই মধ্যেই আরেকটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ অবস্থান সুসংহত করার নিমিত্তে ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। আমাদের ভোটারেরা আসলে দলকেই ভোট দেয়, প্রার্থীকে নয়। একজন গণতান্ত্রিক ভোটারকে অবশ্যই বিচার করতে হয় কোন প্রার্থী তার অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করবে। কিন্তু আমাদের দেশবাসীর ক্ষেত্রে অবস্থাটা সেরকম নয়। একজন প্রার্থীর কর্মকাণ্ড ও ভাবমূর্তির ব্যাপারে তারা সঠিকভাবে চিন্তিত নয়। অনেক অসাধু ও দুর্নীতিবাজ নেতা, সন্ত্রাসী ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপপ্রয়োগকারীরা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয় কারণ আমাদের ভোটাররা ত্রাসের ভয়ে তাদের পক্ষে ভোট প্রদান করে। আবার অনেকসময় ভোটাররা তেমন কোনো পরিশ্রম ছাড়াই ভিত্তিহীন ও বাস্তবতাবিবর্জিত মিষ্টি কথায় ভুলে যায়। নির্বাচনের আগে অল্প দামে ভোটাররা বিকিয়েও যায়। একজন প্রার্থীকে তার কাজের মাধ্যমে বিচার করার মতো যথেষ্ট জ্ঞান ও শিক্ষা তাদের নেই। আবার এমনও হয় যে, প্রার্থীর অসাধু কার্যকলাপ ও ভুল কর্মকাণ্ডের জন্য একজন প্রার্থীর অনেক সমালোচনা করে থাকে। কিন্তু যখন তারা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করে তখন তাদের পক্ষেই ভোট দেয়। আমাদের ভোটাররা এই বিষয়ে সম্পূর্ণ অসচেতন যে, যদিও বা তারা আপাতদৃষ্টিতে একজন খারাপ প্রার্থীকে ভোট দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা লাভবান হয়। কিন্তু এ ধরণের প্রার্থীকে ভোট দানের মাধমে আসলে তারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যতকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। শিক্ষার অভাবে আমাদের ভোটারদের মধ্যে এই বিবেচনাবোধটুকু গড়ে উঠেনি।

একটি দেশের গণতন্ত্রকে নিশ্চিত করতে হলে ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু একজন সমাজবিরোধী দূর্নীতিবাজ প্রার্থীকে ভোট দিলে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কোন সহায়তা হবে না। বরং আমাদেরকে জানতে হবে কিসের উপর ভিত্তি করে একজন প্রার্থীকে যাচাই করতে হবে- তার শিক্ষা, তার অতীত সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড, সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতা, তার দুর্নীতির ইতিহাস, তার অপরাধের ইতিহাস, সমাজ ও সম্প্রদায়ে তার অবদান ইত্যাদি। যদি এইসব ক্ষেত্রে একজন প্রার্থী সফলতার সাথে উঠে আসে, তবেই আমরা তাকে ভোট দিতে পারি।

যদি আমরা সঠিক প্রার্থী নির্বাচনে আমাদের ভোটের অধিকারকে কাজে লাগাতে না পারি, তবে আমরা বাংলাদেশে টেকসই গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে পারবো না। দেশে একটি সুপরিকল্পিতভাবে  উন্নতিগুলো রুখে যাবে। তাই দেশের নেতা তথা লিডার নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের সিদ্ধান্তগুলো আমাদের আবেগ বা লোভ দ্বারা প্রভাবিত হওয়া উচিৎ নয় কারণ আমরা যখন ভোট দিই আমরা আমাদের সম্প্রদায়, সমাজ ও দেশের ভালোর জন্য ভোট দিই। তাই এটি আমাদের কাঁধে একটি বিশাল দায়িত্ব। আমাদেরকে সত্যিকার শিক্ষার হার বাড়ানোর উপর প্রচুর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে যাতে করে আমাদের জনগণ তাদের লাভ ও স্বার্থের ব্যাপারে আরও সচেতন হতে পারে।

এই গুরুত্ববহ বিজয়ের মাসে আমাদের আরও একটি বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে। সেটা নির্বাচনী বিজয়। এবারের নির্বাচনে যাতে জনগনের জয় হয়। সে কথা জানাতেই বাংলার কোটি কোটি জনতার কাছে আমার প্রাণের দাবী। কতিপয় নিদৃষ্টদের জয় দিয়ে নিজেদের বৃত্ত বন্দী করবেন না। আমরা স্বাধীনচেতা জাতী। আমরা বিশ্বের দরবারে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাই। ভয় কে জয় করতে হবে।
সর্বোপরি, ফল আমাদের হাতে। এমন কাউকে নির্বাচিত করুন যিনি আপনার কাছে তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।

গুটি কতক রাজনীতিবিদ এবং তাদের স্বার্থের কাছে দের আমাদের ভাগ্য বন্দী হয়ে থাকতে পারেনা। আমাদের ভবিষ্যত আমাদেরই গড়তে হবে। আমাদের প্রতিনিধিরা ধ্বংসাত্মক রাজনীতি পরিহার নিশ্চিত করে একটি সুখী, উন্নত এবং স্বাভাবিক রাষ্ট্র উপহার দিক। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চাওয়া হোক,
“আমার ভোট আমি দিবো, যোগ্য প্রাথী দেখে দিবো।”

বাকি বিল্লাহ শিবলী
ফ্রান্স প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক
মন্তব্য দিন এখানেই ...