মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ০৪:০১ পূর্বাহ্ন

বিনয় চরিত্রের ভূষণ

  • প্রকাশের সময়ঃ মঙ্গলবার, ১০ নভেম্বর, ২০২০
  • ১৫১ জন পড়েছেন
শেয়ার করুনঃ

মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। বহুধা গুণের সমন্বয়ে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। তন্মধ্যে বিনয় ও নম্রতার হার সিংহভাগ। মানুষের অন্যতম সুকুমার ভূষণ হলো-বিনয় ও নম্রতা।

বিনয় ও নম্রতা সম্পর্কে রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, ‘যারা তোমার অনুসরণ করে সেসব বিশ্বাসীর প্রতি বিনয়ী হও’ (আল-কুরআন, সুরা আশ-শুআরা-২১৫)। ভালো কথা ও উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে শত্রুর মন জয় করা সম্ভব।

বিনয় চরিত্রের ভূষণ। বিনয় মানুষের মনের সৌন্দর্য প্রকাশ করে। বিনয় একজন মানুষকে সহজে সর্বোচ্চ মোকামে পৌঁছে দেয়। বিনয়ী ব্যক্তিকে সবাই পছন্দ করে। অহঙ্কারী বা বদমেজাজি ব্যক্তিকে আল্লাহ অপছন্দ করেন। হজরত রাসূল সা:-এর প্রতি আরবের লোকদের আকর্ষণের ভিত্তি ছিল বিনয়। তিনি কখনো কারো সাথে কর্কশ ভাষায় কথা বলতেন না। কাউকে গালমন্দ করতেন না বা কটুকথা বলতেন না। মন্দ নামে কাউকে ডাকতেন না। আল্লাহ তায়ালা নম্র ব্যবহারকারীকে পছন্দ করেন। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে একে অপরের সাথে নম্র ব্যবহার করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রা: থেকে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূল সা: এরশাদ করেছেন, হে আয়েশা, আল্লাহ তায়ালা অতি নম্র ব্যবহারকারী। সুতরাং তিনি নম্রতা ভালোবাসেন। তিনি নম্রতার জন্য এমন কিছু দান করেন যা কঠোরতার জন্য দান করেন না; এমনকি অন্য কিছুর জন্যও তা দান করেন না। (মুসলিম: ৬৩৬৫)।
মূলত বিনয়ী বা আবেদ লোকেরা কখনো, কোনো অবস্থানেই জাহেল লোকের কথায় উত্তেজিত বা রাগান্বিত হন না। কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘রহমানের বান্দা তো হচ্ছে তারা, যারা জমিনে নেহায়েত বিনম্রভাবে চলাফেরা করে এবং জাহেল লোকেরা যখন তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা নেহায়েত প্রশান্তভাবে জবাব দেয়।’ (সূরা ফুরকান: ৬৩)। ঘরে বাইরে সবখানে আজ বিনয়ের বড় অভাব দেখা যাচ্ছে। যার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মানবিকতার পূর্ণ বিকাশ। আমরা অনেক কিছু থেকে শিখছি, কিন্তু মানুষ হওয়ার দীক্ষা নেইনি আজও। অন্যের কাছ থেকে সত্য মেনে নেয়াকে আজ পরাজয় মনে করা হয়। যারা গলা যত উঁচু, তাকেই বড় বীর ভাবে মানুষ। আমরা এটা ভুলে গেছি যে, মুসলমান হিসেবে এসব আমাদের আচরণ হতে পারে না। স্বার্থবিহীন উদার ও লৌকিকতামুক্ত অকৃত্রিম বিনয় এবং সবার সাথে মার্জিত ব্যবহার ইসলামের প্রথম শিক্ষা। কারণ এমন গুণাবলী দিয়েই তো আল্লাহপাক নবীদেরকে সুশোভিত করেছেন। তারপর দায়িত্ব দিয়েছেন নবুওয়াতের। মানুষকে কাছে টানার জন্য আল্লাহ নবীদেরকে বিনয় ও কোমল ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে বলেছেন। আল্লাহপাক বলেন, আপনি আপনার অনুসারী মুমিনদের জন্য নিজেকে কোমল রাখুন। (সূরা শুয়ারা : ২১৫।)

বিনয়ের আসল অর্থ হচ্ছে সত্যকে দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নেয়া। এর আরেকটি অর্থ নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে না করা। সুফিকূল-শিরোমণি হজরত হাসান বসরী (রহ.) বলেছেন, নিজের ঘর থেকে বের হওয়ার পর যে কারো সাথে সাক্ষাৎ হবে তাকে নিজের চেয়ে ভাল মনে করার নামই হল বিনয়।

ব্যক্তিজীবনে যে যতো বিনয়ী ও নম্র, সে তত বেশি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। বিনয়গুণ দিয়ে অন্যের চোখে বপন করা যায় ভালোবাসার বীজ। আর যারা আল্লাহর হুকুম পালন করে তারা শ্রেষ্ঠ বিনয়ী ও নম্র এবং তাদের বন্ধু আল্লাহ।

মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হলো নিজেকে অন্যের থেকে শ্রেষ্ঠ ভাবা। তবে কখনো কখনো এটি বড় বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায়। অনেক সময় অনেক কাছের মানুষের সঙ্গেও দূরত্ব সৃষ্টি হয়। আর কিছু মানুষ আচরণে ঔদ্ধত্যপূর্ণ হন, তাদের অনেকের মুখের ভাষা খুবই কর্কশ। আর অহংকারে সব সময় নিজেকে মুইকি হনুরে ভাবতে থাকে। মিথ্যে আস্ফাালন ও নিজেকে প্রকাশ করার অযাচিত বাহাদুরি দেখায়। তাদের কারো কারো মধ্যে আবার মানববিদ্বেষও দেখা যায়। সঙ্গে দম্ভও। অনেক উচ্চ শিক্ষিত মানুষকে অনেক সময় এরূপটি করতে দেখা যায়। যা একেবারে অনুচিত। সত্য কথা বলতে কি বিশাল এই পৃথিবীতে মানুষের দম্ভ বা অহংকার করার কিছুই নেই।

আমরা যদি আমাদের মাথার উপরে অবস্থিত ছাদের ন্যায় বিশাল ঐ আকাশের দিকে তাকাই তাহলে কি শিক্ষা পাই? অবশ্যই বিনয়ের শিক্ষা পাই। তাই কবি সুনির্মল বসু বলেছেন, “আকাশ আমায় শিক্ষা দেয় উদার হতে ভাইরে/কর্মী হবার মন্ত্র আমি বায়ুর কাছে পাইরে” আর যদি ফলবান বৃক্ষের দিকে তাকাই তবুও আমরা বিনয়ের শিক্ষা পাই। যে বৃক্ষ অঙ্কুরোদগমের পর থেকে শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে বেড়ে ওঠে মানুষের কল্যাণে নিজেকে অকাতরে বিলিয়ে দেয়। আর ফলসহ বিনয়ের সঙ্গে নিজেকে নুইয়ে দেয়। আর এসব মনুষ্যবিদ্বেষ এবং সবকিছুকে ঘৃণা করার প্রবণতার সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব হলো যারা এরূপ করে থাকেন তারা দিন দিন বন্ধু হারাতে থাকেন। আর তাদের কাছ থেকে অন্য মানুষরাও দিন দিন দূরে সরে যান।

এই পৃথিবীতে কেউই একলা চলতে পারে না। মানুষের জীবন চলার জন্য সঙ্গী তথা বন্ধুর প্রয়োজন আছে। ডেল কার্নেগি তার “বন্ধুও প্রতিপত্তিলাভ” বইয়ে বলেছেন, জীবনে বন্ধু বানান না হয় একলা চলতে হবে।

কারো বন্ধু হতে হলে বা কাউকে আপন করে পেতে হলে তার মন জয় করতে হয়। আর মানুষের মন জয় করা যায় ভালোবাসা এবং বিনয়ের মাধ্যমে। কবি বলেছেন—“বড় যদি হতে চাও/ছোট হও তবে”। এখানে ছোট হওয়া বলতে কবি বিনয়ী হওয়া বুঝিয়েছেন। পৃথিবীতে যে সব মনীষী মানুষের মন জয় করে তাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা কুড়িয়েছেন তারা তাদের চরিত্র তথা আচার-ব্যবহারে এবং কথাবার্তায় বিনয়ী হওয়ার মাধ্যমেই তা পেরেছিলেন। যার ফলে তারা মানুষের মন জয় করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

দাম্ভিক বা অহংকারী হওয়ার বদলে বিনয়ী হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন ইসলামের মহানবী (সা.)। খলিফা হজরত উমর ফারুক (রা.) বলেন, আমি রসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে শুনেছি, যে ব্যক্তি বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করে, আল্লাহতায়ালা তাকে উচ্চ করে দেন। ফলে সে নিজের দৃষ্টিতে ছোট, কিন্তু অন্য সবার দৃষ্টিতে বড় হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি অহংকার করে, আল্লাহতায়ালা তাকে হেয় করে দেন।  ফলে সে নিজের দৃষ্টিতে বড় হলেও অন্য সবার দৃষ্টিতে কুকুর ও শূকরের চেয়েও নিকৃষ্ট হয়। (মাযহারি)।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে অহংকার এবং দাম্ভিকতা থেকে দূরে থাকার ও বিনয়ী হওয়ার তৌফিক দান করুন।

 

লেখক, শিক্ষার্থী

মোঃ মাসুম হোসেন,

বি.এ. অনার্স (ইংরেজি)

এম. এ মাস্টার্স (ইংরেজি)

চট্টগ্রাম কলেজ।

মন্তব্য দিন ...

শেয়ার করুনঃ
মিস করলে পড়ে নিন ...