মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ০৯:৪৪ পূর্বাহ্ন

বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক বাবা মায়ের নিরাপদ আবাস

  • প্রকাশের সময়ঃ শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২০
  • ২৩৫ জন পড়েছেন
শেয়ার করুনঃ

মোঃ মাসুম হোসেন: বৃদ্ধাশ্রম নামটি শুনলেই চোখের সামনে ধরা দেয় ক্রন্দনরত মায়ের মুখ, ম্রীয়মান বাবার দুর্বল চাহনি। এ যেন জীবনের পরম অভিশাপ। সারাজীবন নিজের ছেলে মেয়েদের বড় করে তুলে শেষ জীবনে সন্তানকে অবলম্বন করে বাঁচার চেষ্টা যেন অন্যায়। ‘বৃদ্ধাশ্রম’ শব্দটি আমাদের দেশে এখনও মহামারী হিসেবে ধরা না দিলেও দিন দিন এর আবদার বেড়েই চলেছে।

প্রকৃতির আজব খেয়ালে মানুষ জন্মানোর পর থেকে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। পড়ালেখা শেষ করে সে স্বাবলম্বী হয়। তারপর বিয়ে করে সংসার। এর মাঝে বাবা-মায়েরও বয়স কিন্তু বাড়তে থাকে, কমতে থাকে শরীরের শক্তি, অবলম্বন হয়ে পড়ে সন্তানেরা। সংসারের হাল ধরে সকলের দায়িত্ব নেয় বাড়ির ছেলে। কিন্তু কীসের খেয়ালে অতীতের সব স্মৃতি বিলুপ্ত হতে থাকে ছেলের। চিন্তায় তখন নতুন আত্মীয় স্বজন। ঘরের মাঝে জায়গা পায় অবলা পশুপাখিও। কিন্তু মস্ত ফ্ল্যাটে জায়গার কমতি পড়ে মা বাবার জন্য। এক সময়ের অবলম্বন সময়ের খেয়ালে বোঝা হয়ে পড়ে সন্তানের কাছে। অবশেষে বাবা-মায়ের ঠিকানা হয় বৃদ্ধাশ্রমে। এই ধরণের অভিজ্ঞতা হয়তো এখনো আমাদের সমাজে সচরাচর দেখা যায় না, কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমে না পাঠিয়ে কোনো সেবা-যত্ন ছাড়া ঘরের এক কোণে ফেলে রাখার মধ্যেও নেই কোনো প্রকার বাহাদুরি।

জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ একদিন এক অনুষ্ঠানে দুঃখ করে বলছিলেন “ভাবিনি কখনো বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রম কথাটা শুনতে হবে।” কিন্তু দুঃখজনক হলেও ইদানীং বড় বেশি কানে আসছে ‘বৃদ্ধাশ্রম’ কথাটি।

এবার একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক। পৃথিবীতে প্রথম বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রাচীন চীনে। গৃহছাড়া অবহেলিত ও অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের এ উদ্যোগ ছিল শান রাজবংশের। খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ শতকে পরিবার থেকে বিতাড়িত বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য আলাদা এই আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করে ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছিল এই শান রাজবংশ। প্রাচীন চীনে শান রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত বৃদ্ধাশ্রমের ধারণা বর্তমান সমগ্র বিশ্বে প্রসার লাভ করে।

বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমের ধারণা প্রবর্তন হয় ডা. এ. কে. এম আবদুল ওয়াহেদের হাত ধরে। বার্ধক্যে সবার জন্য শারীরিক-মানসিক সুস্থতা ও স্বস্তিময় জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ডা. এ. কে. এম আবদুল ওয়াহেদের উদ্যোগে ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান। সরকারি উদ্যোগে ১৯৮৫ সালে ঢাকার আগারগাঁওয়ে নিজস্ব ভবন এবং পরে ১৯৯৩-৯৪ সালে সরকারি অনুদানে হাসপাতাল ও হোম ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠানটির ৫০টিরও বেশি শাখা রয়েছে। এ ছাড়া কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যেমন- অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতি, ব্র্যাক, ইআইডি, প্রবীণ অধিকার ফোরাম প্রভৃতি প্রবীণদের কল্যাণে কাজ করে। এই সকল সংস্থা মূলত বৃদ্ধ বয়সে যাদের সহায় সম্বল নেই, তাদেরকে মাথায় রেখেই কাজ পরিচালনা করে।

সবাইকে মনে রাখতে হবে, আজকের নবীন ভবিষ্যতের প্রবীণ। বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক বাবা-মায়ের নিরাপদ আবাসস্থল। ডিজিটাল যুগের ইট-পাথরের পরিবেশেও অটুট থাকুক মিহি সুতায় বাঁধা পরিবারের সেই স্নেহ-ভালোবাসার বন্ধন, শ্রদ্ধা ও মর্যাদা।বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের হাতই হোক বাবা মায়ের অবলম্বন

সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং ধর্মীয় অনুশাসনের অভাবে আমাদের দেশে বৃদ্ধ পিতা-মাতা কত যে অসহায় অবস্থায় জীবনযাপন করছেন, বাইরে থেকে সেটা বোঝা যায় না। অনেক সময় বৃদ্ধ পিতা-মাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাড়ি পাহারা, সন্তান দেখাশোনা, বাজার করানো, সন্তানকে স্কুলে পাঠানো, ধমক দিয়ে কথা বলা, অপমানজনক আচরণ করা, চিকিৎসা না করানো, বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে আলাদা রাখা, এমনকি শেষ সম্বল পেনশনের টাকা, জমি-জায়গা, বাড়ি পর্যন্ত জোর করে লিখে নেওয়া হচ্ছে। অনেক বাবা-মা সন্তান ও পুত্রবধুর কাছ থেকে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এমনকি মাদকাসক্ত ছেলে মেয়ে, বাবা-মাকে হত্যা পর্যন্ত করছে।

অনেক সন্তান বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে বাড়ীতে রেখে তালা বন্ধ করে নিয়মিত স্বামী-স্ত্রী তার কর্মস্থলে চলে যায়। অনেক সময় অনেকে বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে একাকী রুমে আটকা রেখে ৫/৭ দিনের জন্য বাইরে বেড়াতে চলে যায়। তাছাড়া পারিবারিক বা সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বা দাওয়াতে পরিবারের সকল সদস্য অংশ গ্রহণ করলেও বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে ঝামেলা মনে করে সঙ্গে নিতে চায় না। অনেক প্রবীণদের থাকার জায়গাও নিম্নমানের হয়ে থাকে। যেমন বাড়ীর নিচতলায়, বারান্দায়, চিলেকোঠায়, খুপরীঘরে, গোয়ালঘরে এমনকি বাড়ির কাজের লোকের সাথে অমানবিকভাবে থাকতে দেওয়া হয়। অনেক সন্তান সামর্থ্য থাকা সত্তে¡ও বিভিন্ন অজুহাতে অসুস্থ পিতা-মাতার এতটুকু খোঁজ খবর পর্যন্ত নিতে চায় না। তাছাড়া অনেকে ইচ্ছা থাকা সত্তে¡ও দারিদ্রের কারণেও বাবা-মার যতœ নিতে পারে না। অসুস্থ বৃদ্ধ পিতা-মাতা তাদের এই কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারেন না। এত কষ্টের পরেও কেউ ভাল মন্দ জানতে চাইলে সন্তানের মুখ উজ্জ্বলের জন্য বলেন, ‘আমি খুব ভাল আছি’।

বর্তমানে আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি যা ‘জেনারেশন গ্যাপ’ কথাটির অর্থ প্রতিনিয়ত টের পাইয়ে দেয় আমাদের।  ছেলে-মেয়েদের মন-মানসিকতার সাথে সাথে বাবা-মায়ের চিন্তা ভাবনা বদলাতে থাকে না। ছেলে-মেয়েরা প্রতিনিয়ত পাশ্চাত্য প্রভাবে প্রভাবিত। এমন অনেক সংসার আছে যাদের সব কয়টি ছেলেই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে উচ্চতর পড়ালেখা এবং পাকাপোক্তভাবে থাকার উদ্দেশ্যে, ফেলে রেখে যাচ্ছে বাবা মাকে নিজ দেশে। মাঝে মাঝে দেখতে আসা আর আর্থিক সহায়তায় দায়িত্বের মেরুকরণে প্রাসঙ্গিকতা নিশ্চয় রয়েছে। কিন্তু পিতা-মাতারা হয়ে পড়ছে বড় বেশি অসহায়। বুড়ো বয়সে হাতের কাছে কাউকে কা ছে পাওয়ার নেই, যে হতে পারে জীবনের শেষ আশ্রয়স্থল।

সব সময় যে ছেলে মেয়ের অবজ্ঞার কারণেই বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হয় তা কিন্তু নয়। অনেক সময় অনেক নিঃসন্তান বাবা-মা, যারা শেষ বয়সে কারও সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য আকুল হয়ে যায়, তাদের জন্য বৃদ্ধাশ্রম এক আশ্রয়স্বরূপ। সেই দিক বিবেচনা করলে বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু এই সুযোগকে পুঁজি করে অনেকেই নিজেদের বাবা-মাকেও বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে ব্যাকুল। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মাকে সেবা যত্ন করার পরিবর্তে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচার চেষ্টা!

বাবা-মার এই অসহায় দুর্দশা এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। এর সমাধান না করলে প্রত্যেককেই বৃদ্ধ বয়সে এই অবহেলা ও কষ্টের স্বাদ নিতে হবে। অনেক সন্তান তাদের কর্মব্যস্ততার কারণে কর্মস্থল ত্যাগ করে পরিচর্যা বা সেবা যতœ করতে পারে না। অনেক পিতা-মাতা নিজের ভিটা মাটি ছেড়ে বিদেশে সন্তানের সাথে থাকতে পছন্দ করেন না। এই সব নানা কারণে দিনদিন সন্তানদের সাথে বাবা-মা’র সু-সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া অনেক পিতা-মাতার পুত্র সন্তান না থাকায় জামাই-মেয়ের বাড়ীতে থাকতে পছন্দ করেন না।

সবাই মিলে বৃদ্ধাশ্রমকে ‘না’ বলার এটাই যেন প্রকৃত সময়। এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একটাই উপায়; কষ্টের বৃদ্ধাশ্রম নয়, পরিবারই হোক বাবা মায়ের নিরাপদ আবাস।

বৃদ্ধাশ্রম যেন কোনো বাবা মায়ের শেষ ঠিকানা না হয়। আপনি জীবনে প্রথম হাঁটা শিখে ছিলেন বাবা মায়ের হাত ধরে তেমনি আপনার বাবা মা’র জীবনের শেষ হাঁটা যেন হয় আপনার হাত ধরে ।

 

লেখক

মোঃ মাসুম হোসেন

শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ

চট্টগ্রাম কলেজ।

মন্তব্য দিন ...

শেয়ার করুনঃ
মিস করলে পড়ে নিন ...