সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০১:২৪ পূর্বাহ্ন

ভারতের অর্থনীতির নিম্নগতি, বহির্বিশ্বে একঘোরা এবং ধর্ষণ প্রসংগ

  • প্রকাশের সময়ঃ বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২০
  • ৮৪ জন পড়েছেন
শেয়ার করুনঃ

এডিটর’স কলাম

আকতার ইবনে ওয়াহাব
—————————
বেশ কয়েকমাস যাবত প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভালো সম্পর্ক নেই ভারতের। হোক সেটি পররাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনৈতিক এবং সীমান্ত বিরোধ। সবদিক থেকে একে একে সব দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য হারাচ্ছে ভারত। এর কারণ খুজতে গিয়ে ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে- “ভারতের দাদাগিরি ভারতকে একঘরে করেছে। পার্শ্ববর্তী দেশের উপর নিজের আধিপত্য করতে গিয়ে সবার গ্রহণ যোগ্য হারাতে হচ্ছে।”

ভালো নেই ভারতের অর্থনীতির অবস্থা। করোনার পূর্ব থেকে চলছে মন্দাভাব। বিবিসির শিরোনাম করেছে-” করোনা ভাইরাস: মহামারিতে বিধ্বস্ত ভারতের অর্থনীতির মাথা তুলে দাঁড়ানো যে কারণে কঠিন হবে।” এই রিপোর্টে উঠে এসেছে ভারতের খাদ্য সংকটের দূরাবস্থার কথা। যেখানে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মানুষের মাঝে রান্না করে খাদ্য বিতরণ করছে।

এর রেশ না কাটতে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতাদের চলছে একের পর এক নারীদের ইজ্জত নিয়ে গণধর্ষণ কান্ড। গত ২ অক্টোবর ভারতের উত্তর প্রদেশে দলগত ধর্ষণের পর দলিত এক তরুণীর মৃত্যু পর দেশজুড়ে সৃষ্ট ক্ষোভের মধ্যে ওই একই রাজ্যে আরেক দলিত তরুণী দলগত ধর্ষণ, নির্যাতনে মারা গেছেন। প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল রাজ্যটির হাথরাসে আর দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে ৫০০ কিলোমিটার দূরের বলরামপুরে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বলরামপুরে ২২ বছর একজন দলিত তরুণীকে দলগতভাবে ধর্ষণ ও নির্যাতনের পর গুরুতর আহত অবস্থায় দেড়শ কিলোমিটার দূরে লখনউয়ের হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার মৃত্যু হয়, জানিয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যম। সব মিলিয়ে আজকের এডিটর’স।

ভারতের বন্ধুরীতি এবং সেল্ফিশঃ
তবে কথায় আছে- কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়। কিন্তু আমরা ভারতের কাছে এমন আচরণ কখনো স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেখেনি। সব সময় আমাদের দেশ থেকে ভারত কেবল নিয়ে যাচ্ছে। বিপরীতে আমরা কিছু পাওয়া তো দূরে থাক উল্টো আমাদের থেকে নিয়েও যেন তাদের শুকরিয়া নেই। আরো দাও আরো দাও! সাথে চলছে সীমান্তে নির্বিচারে মানুষ হত্যা। অবশেষে, আমাদের দেশের শীর্ষ মিডিয়া শিরোনাম করতে বাধ্য হল- “ভারত আমাদের ১৬ আনা পেল।”

আমাদের দেশের সাথে যাই করছে তা অন্য পার্শ্ববর্তী দেশের সাথেও একই আচরণ করছে না এর গ্যারান্টি কি? সকলে বলছে ভারত তাদের সাথে ভালো আচরণ করছে না। কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের নিষ্ঠুরতম আচরণ বিশ্বব্যাপী ভালো করে উপলব্ধি করেছে। আর এস এস নিয়ে ভারতের দিল্লিতে মুসলিম নিধনযজ্ঞ গণহত্যা বিশ্ব ভুলে যায়নি। আর এটি কেউ ভালোভাবে নেয়নি।

অর্থনীতির নিম্নগামীতায় ভারতঃ
ভাল নেই ভারতের অর্থনীতির অবস্থা। এশিয়ায় বারবার নিজেদের অবস্থান দাদাগিরিতে রাখতে চাইলেও তা ব্যাহত হচ্ছে। ভারতের সংবাদমাধ্যম নিজেদের চেহারা সিনেমার মত আধুনিকতা দেখাতে চাইলেও বাস্তবিক চেহারা উঠেছে সেকেলের মতই। ভারতের অর্থনীতির বর্তমানে যেভাবে নিম্নগামী হচ্ছে তা ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ মন্দাভাব বলে বিবিসি নিউজে উঠে এসেছে।

ভারতের অর্থনীতির থিংক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি(সিএমআইই) এর দাবি, চলতি অর্থবর্ষে এখনও অবধি যে পরিমাণ বিনিয়োগ এসেছে, তাতে এ বছর মোট প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ ৫ ট্রিলিয়ন টাকার নিচেই থাকবে। যা কিনা ২০০৪-০৫ অর্থবর্ষের পর একেবারে সর্বনিম্ন।

ভারতের অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিত বসু বলেন, লকডাউনের আগে থেকেই ক্রমাগত সঙ্কুচিত হচ্ছিল ভারতের অর্থনীতি, লকডাউন শুধু ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ দিয়েছে।

“গত দুবছর ধরে প্রতিটা ত্রৈমাসিকেই ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার ক্রমাগত কমেছে। বিনিয়োগ যেমন কমেছে, তেমনই কমেছে রপ্তানি। অর্থনীতির মূল অভিমুখটাই ছিল অনেকদিন ধরেই নিম্নগামী। তার ওপরে এই লকডাউন হয়েছে – পৃথিবীর মধ্যে সবথেকে কড়া লকডাউন হয়েছে। তার প্রভাব কোভিড সংক্রমিতর সংখ্যায় খুব একটা দেখিনি – কিন্তু অর্থনীতির একেবারে যাকে বলে বারোটা বেজে গেছে,” মন্তব্য করেন এই অর্থনীতিবিদ ড. প্রসেনজিত বসু।

আরেক অর্থনীতিবিদ অভিরুপ সরকার বলেন, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোটা অত সোজা হবে না।
“প্রথমত মহামারিটা কতদিন চলবে আমরা জানি না। আর যতদিন মহামারি চলবে, ততদিন অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না। আমার আশঙ্কা আরও একটা বা দুটো ত্রৈমাসিকেও নেতিবাচক বৃদ্ধি, অর্থাৎ সঙ্কোচন দেখতে পাব আমরা।

একঘরে ভারতঃ
ভারত একসময় পাকিস্তানকে বলেছিল- পাকিস্তান একঘরে হয়ে যাবে। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। ভারত এখন অনেকটা একঘরে হয়ে আছে।

নেপাল একই ধর্মাবলম্বী দেশ হয়েও ভারতের বিরোধিতা করতে বাধ্য হল। নেপালের পুলিশ ভারত সীমান্তে ভারতের জওয়ানকে হত্যা করার সাহস দেখিয়েছে। আমরা বাংলাদেশীরা কিছু বললে মৌলবাদ নিয়ে প্রশ্ন উঠে। এ যেন বিপদ! ভুটান, শ্রীলঙ্কা সবই ভারত বিরোধী। চিরশত্রু পাকিস্তান তো বাদই দিলাম। বানিজ্যিক বন্ধু রাষ্ট্র চীনের সাথে যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান। সীমান্তে দুই দেশের টানা কয়েকমাস যুদ্ধের দামামায় ভারত আগ্রাসী ভূমিকা নিলেও বারবার হোচট খেয়ে পিছনে যাচ্ছে। প্রথমদিকে আমেরিকার সমর্থন পেলেও বিশ্বাসের ঘাটতিতে আবার যুদ্ধ থেকে পিছু হটে। চীন ঠিকই তার শক্তি দিয়ে ২৩ ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা এবং জওয়ান হত্যা করে। ভারত এর প্রতিশোধের দ্বারেও যেতে পারেনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী কেবল মিডিয়ায় মুখের বুলি হুংকার দিয়ে দেশের জনগণ এবং বিরোধীদলকে শান্ত রেখেছে।

পারস্য উপসাগরীয় দেশ ইরানের সঙ্গে একসময় ভাল সম্পর্ক থাকলেও পাকিস্তানের সাথে ইরান-তুরষ্ক ভালো সম্পর্ক থাকায় এখন ইরানও ভারতকে ছেড়ে দিয়েছে। ভারতের প্রতি ইরানের অনাস্থা এসেছে রেল লাইন সম্প্রসারণে দুই দেশের চুক্তিতে ভারত অর্থ না দেয়াকে কেন্দ্র করে এবং আমেরিকার উপর নির্ভরশীল হওয়াতে।

বহির্বিশ্বের সাথে ভারতের সম্পর্ক ভালো নেই চীন-ভারত যুদ্ধাবস্থা থেকে বুঝা যায়। ভারত প্রথমে তাদের মিত্র আমেরিকার উপর নির্ভর হয়ে চীনকে হুংকার দিয়েছিল বটে।এমনকি পুরনো বন্ধু ইরানের সাথে সম্পর্ক কমাতে দ্বিধা করেনি ভারত। কিন্তু সেই মিত্র আমেরিকা নিজের আখ গোছাতে ভারত ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যে আরবের ভূমিতে পা দিয়েছে। পরে অস্ত্র নির্ভর রাশিয়ায় দোড়যাপ শুরু করে ভারত। কিন্তু তাতেও সুফল আসেনি। ভারত আমেরিকার মিত্র হওয়ায় ভালোভাবে নেয়নি রাশিয়া। চীনের পক্ষ নিয়েছে রাশিয়া।

রাশিয়ার কাছে ভালো খবর না পেয়ে আবার ইরানের কাছে মাথা নোয়াতে শুরু করে ভারত। রাশিয়া থেকে ফিরে ইরান সফরে যায় ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এর একদিন পর আবার ইরান সফরে গেল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকর। এর থেকে বুঝা যায়, ভারতের পররাষ্ট্র রীতিতে স্বার্থপরতা এবং উপকার করার নীতি না থাকায় বহির্বিশ্বে সকলকে হারাতে বসেছে। হয়তো এটি উপলব্ধি করার ভারতের সময় এসেছে।

ভারতে গণধর্ষণঃ
ভারতে প্রতিনিয়ত ধর্ষনের ঘটনা ঘটে থাকে। কিন্তু সম্প্রতি একের পর এক গণধর্ষণের ঘটনায় উত্তাল রয়েছে ভারত। আর এই ঘটনার সাথে জড়িত রয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতা। পুলিশ বলছে, স্থানীয় বিজেপি যুব মোর্চার সহ-সভাপতি শ্যাম প্রকাশ দ্বিবেদীসহ দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে গণধর্ষণকান্ডে। অপরজনের নাম অনীল দ্বিবেদী। তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠানো হয়েছে।

ভারতের অর্থনীতিবিদ এবং বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, ভারতের অর্থনীতি বড় ধরনের খারাপের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তাই জনগণকে এর দিকে মনোযোগ ফিরিয়ে দিতে পররাষ্ট্রনীতিকে বেছে নিয়েছে। কখনো চীন, কখনো যুদ্ধের হুংকার, কখনো কাশ্মীর ইস্যু। হয়তো এর সাথে যোগ হয়েছে গণধর্ষণের মত নতুন ইস্যু। যা কিনা অর্থনীতি, রাজনীতি ইস্যু থেকে জনগণকে ভুলিয়ে রাখা যাবে। কিন্তু মোদি সরকার এবং এসব কূটচালদের বুঝা উচিত এর একদিন শেষ আছে।

মন্তব্য দিন ...

শেয়ার করুনঃ
মিস করলে পড়ে নিন ...