সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০২:১৫ পূর্বাহ্ন

মহা বিজ্ঞানময় কুরআন; শিহাব ইকবাল

  • প্রকাশের সময়ঃ বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৪৬ জন পড়েছেন
শেয়ার করুনঃ

নিউজ ডেস্ক

আল কুরআন আল্লাহর কিতাব। সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী ও রাসুল হযরত মুহম্মদ ( স ) এর উপর এটি অবতীর্ণ হয়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতিকে সুপথ প্রদর্শনের জন্যে এবং সর্বপ্রকার পাপ-পঙ্কিলতা ও বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করার জন্যে যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন এবং অনেক কিতাব নাযিল করেছেন। তাঁর মোট নাযিলকৃত ১০৪ খানা কিতাবের মধ্যে ৪ খানি কিতাব প্রসিদ্ধ ও বড়ো। আমরা সবাই সেগুলোর নাম জানি। সেগুলো হলো তাওরাত, যবুর, ইনজিল ও কুরআন। তাওরাত হযরত মুসা (আ)-এর উপর, যবুর হযরত দাউদ (আ)-এর উপর, ইনজিল হযরত ঈসা (আ)-এর উপর এবং কুরআন হযরত মুহম্মদ (সা)-এর উপর অবতীর্ণ হয়। একমাত্র মহাগ্রন্থ আল কুরআন ছাড়া অন্যান্য সকল কিতাব মানবজাতির বাড়াবাড়ির দরুন বিকৃত হয়ে গেছে। এর প্রমাণ পাই আমরা কুরআন-হাদিস থেকে এবং ‘বাইবেল, বিজ্ঞান ও কুরআন’ নামক অসামান্য ও প্রসিদ্ধ গবেষণাগ্রন্থ থেকে। এ গ্রন্থটি রচনা করে ড. মরিস বুকাইলি সারাবিশ্বে সৃষ্টি করেছেন তুমুল আলোড়ন। বিভ্রান্ত ও হটকারীদের জন্যে এটি একটি মারাত্মক দাঁতভাঙা বই। একমাত্র আল কুরআনেই পাওয়া যায় নির্ভুল ঐতিহাসিক তথ্য ও তত্ত্ব এবং নির্ভুল বৈজ্ঞানিক তথ্য ও তত্ত্বের সমাহার। এখন আমি ইনশাআল্লাহ বেশকিছু সুপ্রতিষ্ঠিত, প্রমাণিত ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে কুরআনের আলোকে উপস্থাপন করবো।

আধুনিক তত্ত্ব বলে যে, মহাবিশ্ব আপাত প্রসারমান। ১৯২০ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডুইন হাবল ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে এই ঘটনা সর্বপ্রথম পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন যে , ছায়াপথগুলো স্থির নয়, বরং পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। হাবল বলেন, মহাবিশ্ব ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। বর্ণালির লাল অপসরণ বা লোহিত ভ্রংশ থেকে বোঝা যায় যে, ছায়াপথগুলো দূরে সরে যাচ্ছে। আলোর উৎস যখন পর্যবেক্ষক থেকে দূরে সরে যেতে থাকে, তখন আলোর কম্পাঙ্ক হ্রাস পেতে থাকে এবং দৃশ্যমান বর্ণালির লোহিত বা লাল রং-এর দিকে সরে যায়। একেই বলা হয় লাল অপসরণ বা লোহিত ভ্রংশ। হাবল দেখান যে, ছায়াপথগুলোর দূরে সরে যাওয়ার দ্রুতি তাদের পরস্পরের মধ্যকার দূরত্বের সমাণুপাতিক। ছায়াপথগুলোর পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব যতো বেশি, তাদের সরে যাওয়ার দ্রুতি ততো বেশি। সুতরাং আমাদের মহাবিশ্ব নিশ্চিতভাবেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। আজ থেকে ১৪০০ বছরেরও বেশি আগে নাযিলকৃত মহাগ্রন্থ কুরআনে মহাবিশ্বের এই সম্প্রসারণের সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। সূরা যারিয়াত-এর ৪৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন :
‘এবং আমি আকাশকে নিজ ক্ষমতাবলে নির্মাণ
করেছি এবং আমি অবশ্যই সম্প্রসারণকারী। ‘

আধুনিক তত্ত্ব বলে যে, ছায়াপথগুলো কোনো এক সময়ে সঙ্কুচিত অবস্থায় একত্রে ছিলো এবং মহাবিশ্বের বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে উৎপন্ন হয়েছে। শুরুতে মহাবিশ্ব ছিলো একটি অতিঘন গ্যাসীয় ও ধূলিমেঘ। এই মেঘ ছিলো প্রধানত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস দিয়ে তৈরি। নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ ইত্যাদির জন্ম ও বিবর্তন তাই ভারি মজার। নক্ষত্রের সৃষ্টি হয় এই অতিঘন গ্যাসীয় ও ধূলিমেঘের মহাকর্ষীয় ভাঙ্গনের ফলে এবং গ্রহ-উপগ্রহের সৃষ্টি হয় নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা অবশিষ্ট গ্যাস ও ধূলিকণার ঘনীভবনের ফলে। এই প্রক্রিয়ায় বেশ সুদীর্ঘ সময়কালের প্রয়োজন হয়। ১৯২৭ সালে বেলজিয়ামের জ্যোতির্বিজ্ঞানী জি লেমেটার মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের যে ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন, তাতে তিনি বলেন যে, দূর অতীতে ( ১৫ বিলিয়ন বা ১৫০০ কোটি বছর পূর্বে ) মহাবিশ্বের সমস্ত বস্তু সঙ্কুচিত অবস্থায় একটি বিন্দুর মতো ছিলো ঠিক যেন একটি অতি পরমাণু। আজ থেকে ১৫ বিলিয়ন বছর পূর্বে এই অতি পরমাণুর মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটে, ফলে মহাবিশ্ব অবিরতভাবে সম্প্রসারিত হতে থাকে। পুঞ্জ পুঞ্জ বস্তু চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছুটতে থাকে। এসব পুঞ্জ থেকেই তৈরি হয়েছে ছায়াপথ , গ্রহ, উপগ্রহ ইত্যাদি। সেই থেকে মহাবিশ্বের সবকিছু অবিরাম পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আদি এই বিস্ফোরণকেই বলা হয় বিগ ব্যাং। বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তাঁর A Brief History of Time গ্রন্থে মহাবিশ্ব সৃষ্টির এই ‘বৃহৎ বিস্ফোরণ’ তত্ত্বের পক্ষে যুক্তি দেন এবং পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এর ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন।

আমরা দেখতে পেলাম আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে দুটো সময়কাল বা দুটো পর্যায় অতিবাহিত হয়েছে। প্রথমে অতিঘন গ্যাসীয় ও ধূলিমেঘের মহাকর্ষীয় ভাঙ্গনের ফলে নক্ষত্রের সৃষ্টি হলো এবং অতঃপর নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা অবশিষ্ট গ্যাস ও ধূলিকণার ঘনীভবনের ফলে গ্রহ-উপগ্রহের সৃষ্টি হলো। আবার, এই পৃথিবী ও তার মানুষকে পরিপূর্ণতা অর্জন করতে বা আধুনিক ও বর্তমান রূপ লাভ করতে অতিক্রম করতে হয়েছে চারটি স্তর। সৃষ্টি, সংস্কার ও বিবর্তনের এই চারটি স্তর বা সময়কালের কথাও বিজ্ঞান কর্তৃক এখন সুপ্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত সত্য যাকে বলা হয় হাইপোথিসিস। এখন সময়কালের মোট সমষ্টি দাঁড়ালো ছয়।

মহাবিশ্বে রয়েছে প্রায় একশ বিলিয়ন ছায়াপথ আর আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গায় রয়েছে একশ বিলিয়ন নক্ষত্র। বোঝাই যাচ্ছে মহাবিশ্ব হলো অসংখ্য বা বহু আকাশের সমষ্টি। একেকটি ছায়াপথ একেকটি আকাশ। আরবি ভাষায় দুটো সংখ্যা দিয়ে বহুত্ব বোঝানো হয় – একটি ৭ এবং অপরটি ৭০। বিশেষ করে ৭ সংখ্যাটি বহুত্ব বোঝানোর জন্যে এখনো আরব দেশে ও আরবি ভাষায় সুপ্রচলিত। এখন আমি মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সূরা হা মিম সিজদা-এর ৯ থেকে ১২ নম্বর আয়াতসমূহ আপনাদের সামনে উপস্থাপন করবো যাতে আপনারা এতক্ষণ ধরে বর্ণিত বৈজ্ঞানিক তথ্য ও তত্ত্বগুলোকে সেখানে সংক্ষিপ্তাকারে অথচ সুস্পষ্টভাবে দেখতে পান।
‘বলুন, তোমরা কি সে সত্তাকে অস্বীকার করো
যিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন দুদিনে ( দুটি
সময়কালে ) এবং তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ
স্থির করো? তিনি তো সমগ্র বিশ্বের পালনকর্তা।
তিনি পৃথিবীতে উপরিভাগে অটল পর্বতমালা
স্থাপন করেছেন, তাতে কল্যাণ নিহিত রেখেছেন
এবং চারদিনের ( চারটি সময়কালের ) মধ্যে
তাতে তার খাদ্যের ও অন্যান্য সব প্রয়োজনীয়
দ্রব্যসামগ্রীর ব্যবস্থা করেছেন – পূর্ণ হলো
জিজ্ঞাসুদের জন্যে। অতঃপর তিনি আকাশের
দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিলো ধোঁয়া,
অতঃপর তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন,
তোমরা উভয়ে আসো ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়।
তারা বললো, আমরা স্বেচ্ছায় আসলাম।
অতঃপর তিনি আকাশমণ্ডলীকে দুদিনে ( দুটি
সময়কালে ) সপ্তআকাশ করে দিলেন এবং
প্রত্যেক আকাশে তাঁর আদেশ প্রেরণ করলেন।
আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা
সুশোভিত ও সংরক্ষিত করেছি। এটা
পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা।’
এখানে ‘দিন’কে যে বন্ধনীতে ‘সময়কাল’ লিখেছি, তা এজন্যে যে, মহাগ্রন্থ কুরআনেই মহান আল্লাহ
রাব্বুল আলামিন কেয়ামতের দিনের সাথে আমাদের নিত্য-নৈমিত্তিক দিনের তুলনা করে বলেছেন, ওই দিন আমাদের হিসেবের পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। অতএব এই আয়াতগুলোতে যে দিনের উল্লেখ করা হয়েছে, তা চব্বিশ ঘণ্টার দিন নয়, বরং কেয়ামতের দিনের সাথেই তুলনীয় সময়কাল।

আধুনিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হতে কিছু আগেই আমরা জেনেছি, আজকের অসংখ্য নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ ইত্যাদি সবকিছুই কোনোএক সময়ে সঙ্কুচিত অবস্থায় একত্রে ছিলো এবং পরে আলাদা আলাদারূপে উৎপন্ন হয়েছে। এই তত্ত্বটিও আজ হতে ১৪০০ বছরেরও বেশি আগে কুরআনে উল্লিখিত হয়েছে। সূরা আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন :
‘কাফেররা কি ভেবে দেখেনা যে আকাশমণ্ডলী
ও পৃথিবী পরস্পর সংযুক্ত ছিলো, অতঃপর
আমি উভয়কে বিচ্ছিন্ন করে দিলাম এবং
প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি
করলাম। এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন
করবেনা?’

আধুনিক তত্ত্ব বলে – একটি ছায়াপথ হতে আরেকটি ছায়াপথ পর্যন্ত যে দূরত্ব রয়েছে, তাতে রয়েছে অসংখ্য বস্তুকণা যেগুলোকে এক ছায়াপথ থেকে আরেক ছায়াপথ পর্যন্ত সেতুর মতো দেখায়। এই তত্ত্বটিও মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আমরা পাই।
সূরা কাফ-এর ৩৮ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন :
‘আমি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও এতদুভয়ের
মধ্যবর্তী সবকিছু ছয়দিনে ( ছয়টি সময়কালে )
সৃষ্টি করেছি এবং আমাকে কোনোরূপ ক্লান্তি
স্পর্শ করেনি।’
একটু আগেই সূরা আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে আরো একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব লক্ষণীয়। সেটা এই যে, সকল প্রাণী তথা প্রাণসম্পন্ন সবকিছু
পানি থেকে সৃজিত হয়েছে। এছাড়া, সূরা কাফের ৩৮ নম্বর আয়াতে যে মধ্যবর্তী বস্তুর কথা বলা হয়েছে, বিজ্ঞান তার নাম দিয়েছে ইন্টারস্টেলার মেটেরিয়েলস।

মানুষ উন্নতি লাভ করতে করতে অবশেষে গমণ করেছে মহাশূন্যে। এমনকি, সে চাঁদেও অবতরণ করেছে এবং অদ্যাবধি মহাশূন্যে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। মহাশূন্যে অভিযানের ফলশ্রুতিতে সে জানতে পেরেছে অসংখ্য তথ্য ও তত্ত্ব। এই মহাশূন্য গমণ এবং চাঁদে অবতরণের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত আজ থেকে ১৪০০ বছরেরও বেশি মহাগ্রন্থ আল কুরআন আমাদেরকে দিয়েছে। সূরা হিজরের ১৪ ও ১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে :
‘যদি আমি ওদের সামনে আকাশের কোনো
দরজাও খুলে দিই আর তাতে ওরা দিনভর
আরোহণও করতে থাকে, তবুও ওরা এ কথাই
বলবে যে, আমাদের দৃষ্টির বিভ্রাট ঘটানো
হয়েছে – বরং আমরা জাদুগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।’
সূরা আনআমের ১২৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে :
‘অতঃপর আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করতে চান
তার বক্ষকে ইসলামের জন্যে উন্মুক্ত করে দেন
এবং যাকে বিপথগামী করতে চান, তার
বক্ষকে সংকীর্ণ – অত্যধিক সংকীর্ণ করে দেন
যেন সে সবেগে আকাশে আরোহণ করছে।’
সূরা রাহমানের ৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে :
‘হে জ্বিন ও মানবকুল, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের
প্রান্ত অতিক্রম করা যদি তোমাদের সাধ্যে
কুলোয়, তবে অতিক্রম করো। কিন্তু
অসাধারণ শক্তি ও ক্ষমতা ব্যতীত তোমরা তা
অতিক্রম করতে পারবেনা।’

শিহাব ইকবাল

প্রিন্সিপাল, মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজ  
চলবে…

মন্তব্য দিন ...

শেয়ার করুনঃ
মিস করলে পড়ে নিন ...