সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০১:৫৯ পূর্বাহ্ন

রাসূল সাঃ রূহানী শিক্ষার দিকে প্রত্যাবর্তনই আশরার শিক্ষা; ফরহাদ মাজহার

  • প্রকাশের সময়ঃ রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২০
  • ৫৬ জন পড়েছেন
শেয়ার করুনঃ

“চিরকালের জন্য তোমরা নিজেদের জন্য অপরাধ ও লজ্জা রেখে এসেছ এবং চিরন্তন লাঞ্ছনা খরিদ করেছ। কোনদিনই এ লাঞ্ছনা দুর করতে সক্ষম হবে না। কোন পানি দিয়েই তা ধুয়ে ফেলতে পারবে না। কারন তোমরা হত্যা করেছ হুসাইনকে যিনি হচ্ছেন খাতেমুন্নাবিয়্যিন সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের কলিজার টুকরা, বেহেশতি যুবকদের নেতা।” – জয়নব বিনতে হজরত আলী।
…………………………………………………..

আজ ১০ মোহাররম। আশুরা। কারবালায় রাসুলে করিম হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের অতি আদরের নাতি ইমাম হোসেন ইবনে আলীর আত্মীয় এবং সমর্থকদের মধ্যে উমাইয়া খলিফা প্রথম এজিদের মধ্যে যুদ্ধে ইমাম হোসেন তার ছয় বছরের শিশু সন্তান আলী আল-আসগর ইবনে হোসাইন সহ সকলে শাহাদত বরণ করেন। জীবিত ব্যক্তিদের এজিদ বাহিনী বন্দি করে। বন্দিদের প্রায় সকলেই ছিলেন নারী ও শিশু। তাঁদেরকে কূফায় ইবনে জিয়াদের দরবারসহ নানা স্হানে বন্দি অবস্হায় আনা হয়। সেই সময় হযরত জয়নব বিনতে হযরত আলী যেসব দুর্দান্ত বক্তব্য দিয়েছিলেন, ওপরের উদ্ধৃতি তেমনি একটি ভাষণ থেকে নেওয়া।

এই অতি শোকাবহ ঘটনায় মাতম ও শোকের যে আর্তনাদ সেই সময় নারীদের মধ্য থেকে উত্থিত হয়ে আল্লার আরশ কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেই শোকের মাতমই পরবর্তীতে মোহররমের মাতমে রূপ নিয়েছে, এই মাতম মানবেতিহাস বয়ে চলেছে। কিন্তু পুরুষতন্ত্র আজও সকল নারীর — অর্থাৎ ভগিনী ও জননী নির্বিশেষে প্রতিটি নারীর এই অবিনাশী আর্তনাদের গভীর ও সুদূর প্রসারী তাৎপর্য ধরতে পারে নি। সন্তান, ভাই, স্বামীর লাশের ভার অসহনীয়, পুরুষের পক্ষে এই অতি সাধারণ সত্যের উপলব্ধি অসম্ভবই বটে।

অতএব এই আর্তনাদ স্রেফ মুসলমানের আর্তনাদ ভাবলে ভুল হবে। ঠিক যে কারবালা ক্ষমতার জন্য মুসলমানদের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও হানাহানির রক্তাক্ত ইতিহাস। এই মাতম তথাকথিত ‘সুন্নি’ থেকে আলাদা ‘শিয়া’দেরও মাতম নয়। ইসলামে কোন শিয়া সুন্নি নাই। বরং এই মাতমকে বুঝতে হবে যুদ্ধবাজ, হত্যালিপ্সু, পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিরুদ্ধে রাসুলে করিমের রুহানি শিক্ষার দিকে প্রত্যাবর্তনের আহ্বান।

কি সেই শিক্ষা? সংক্ষেপে সেটা হচ্ছে সকল প্রকার রক্তবাদ, গোত্রবাদ, বংশবাদ, অভিজাততন্ত্র, জাতিবাদ, ভূখণ্ড-প্রীতি — অর্থাৎ যা কিছু মানুষকে ইহলৌকিক স্বার্থে পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত করে, সেই সকল কুফরি উৎখাত করে মানুষকে ‘এক’-এর নিকটবর্তী করা, যেন বিভিন্ন ও বিচিত্র মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক নির্মানের বাস্তব শর্ত গড়ে উঠতে পারে। এই একত্ববাদকে নিছকই ধর্মতত্ত্বে, জ্ঞানতত্ত্বে রোমান্টিক কল্পনায়, কিম্বা কোন মূর্ত বা বিমূর্ত পরিচয়মূলক তত্ত্বে পর্যবসিত করলে সেটা আর ইসলাম থাকে না। ইসলামের একত্ববাদ বা তৌহিদ পুরাপুরি রাজনৈতিক। ইসলাম মানবজাতিকে নিয়ে একটি ‘উম্মাহ’ ‘ বা বিশ্বসমাজ গড়তে চায়, কারন সকলকে একই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন।

মানুষের সঙ্গে মানুষের রুহানি সম্পর্ক নির্মাণের মধ্যেই সার্বজনীন আনন্দ নিহিত। মানুষের রুহানি ক্ষমতার প্রকাশও পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক নির্মাণের সফলতায়। কোরেশদের যে অভিজাততন্ত্র, রক্তবাদ ও গোষ্ঠবাদ রাসুলে করিম উৎখাত করেছিলেন, যাদের দম্ভ মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে চূর্ণ করে ফেলা হয়েছিল — নবীর ওফাতের পর মারামারি হানাহানি রক্তপাতের মধ্য দিয়ে পুরানা জাহেলি ব্যবস্থা পুনরায় বহাল করা হয়েছে। একে অকপটে স্বীকার করা এবং এই অধঃপতন থেকে বের হয়ে আসা জরুরি হয়ে পড়েছে।

আজ একই তারিখে জোরপূর্বক গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে জাতিসঙ্ঘের ঘোষিত আন্তর্জাতিক দিবস (International Day of the Victims of Enforced Disappearances)। গুম রাষ্ট্রের দ্বারা সংঘটিত অতিশয় জঘন্য একটি অপরাধ। এই অপরাধের যারা শিকার — অর্থাৎ গুম হওয়া মানুষটিসহ তাদের পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজন — সকলের পাশে দাঁড়াবার এবং তাদের স্মরণ করবার জন্যই এই বিশেষ দিনটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

এই দিনটিকে আমরা স্মরণ করি।

মন্তব্য দিন ...

শেয়ার করুনঃ
মিস করলে পড়ে নিন ...